সাজেকে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে ঝুঁকিতে পর্যটন

সাজেকে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে ঝুঁকিতে পর্যটন

ফন্ট সাইজ:

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে পর্যটকবাহী গাড়িবহরে হামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ এবং প্রায় চার হাজার পর্যটক আটকে পড়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র রাজনীতি, আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির নিরাপত্তা। সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় পার্বত্য চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের দায়ী করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপারও সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হামলার সঙ্গে ইউপিডিএফ’র নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। তবে, ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে।

রাঙ্গামাটির সবচেয়ে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ির আয়তনে বৃহত্তম ইউনিয়ন সাজেক। ভারতের মিজোরাম সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি এ জনপদ একসময় দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পরিচিত ছিল। গত দেড় দশকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি এবং পর্যটন অবকাঠামো গড়ে ওঠার মধ্যদিয়ে সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাজেক ভ্যালির পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তরাঁ, পরিবহন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা ব্যবসা। স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতেও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, সাজেকের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফ’র প্রভাব ও সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল। দুর্গম পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি, সীমান্তবর্তী অবস্থান এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে এ অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চলাচল ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্যও জটিল।

সূত্রগুলো জানায়, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রভাব বিস্তারের ফলে ইউপিডিএফ’র চলাচল ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ ঘিরে বিরোধের বিষয়টিও সামনে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, সাজেকের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব লেনদেনের পরিমাণ শতকোটি টাকা প্রায়। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের প্রভাব বাড়ায় ইউপিডিএফ’র অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতের পাশাপাশি অবরোধ, পর্যটন চলাচলে বাধা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরির মতো কৌশল ব্যবহারের চেষ্টায় নেমেছে ইউপিডিএফ।

সাজেকের সর্বশেষ ঘটনার আগে থেকেই সেখানে অবরোধ কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা চলছিল। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি এসোসিয়েশনের ব্যানারে আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে। তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ার কথা জানিয়ে সংগঠনগুলো ২২শে অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের ২১শে অক্টোবরের মধ্যে এলাকা ছাড়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরদিন পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের মধ্যেই গঙ্গারাম বাজার এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটে।

আইএসপিআরের বক্তব্য, অবরোধের কারণে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, ২২শে অক্টোবর সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পরিস্থিতি সমাধানে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। বিবৃতির ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে অবরোধকারীদের একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং যান চলাচল পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নেয়। এরপর আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে প্রাথমিক তথ্যের বরাতে জানিয়েছে আইএসপিআর। আত্মরক্ষা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলি চালালে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

আইএসপিআর ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করে আরও জানায়, স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়।