যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থলসীমান্তপথ বন্ধ অথবা কঠোরভাবে সীমিত করেছে পাকিস্তান ও ইরাক। এতে আগে থেকেই মার্কিন নৌ অবরোধ ও সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা ইরানের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়তে পারে। আঞ্চলিক একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সমুদ্র ও আকাশপথে বাণিজ্যের অধিকাংশ সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে স্থলপথে পণ্য পরিবহনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছিল তেহরানের। কিন্তু পাকিস্তান ও ইরাকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে সেই বাণিজ্যপথগুলোও চাপে পড়েছে।
পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ও ইরাক, ইরানে প্রবেশ ও দেশটি থেকে বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থলপথ বন্ধ করছে। এর ফলে মার্কিন নৌ অবরোধ এবং বিমান সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার পর ইরানের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। এদিকে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে।
পাকিস্তানে সীমান্ত বাণিজ্য স্থগিত
গত অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের তাফতান ও গাবদ-রিমদানের সীমান্তপথ দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন স্থগিত করা হয়। পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত বাণিজ্য সহজীকরণের আগের একটি আদেশ প্রত্যাহার করে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়।
বেলুচিস্তানের উপদেষ্টা শহিদ রিন্দসহ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এ পদক্ষেপের পক্ষে নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার যুক্তি তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তারা পরিস্থিতিকে সাময়িক বিঘ্ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, কারিগরি সমস্যার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি সমাধানে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে।
কয়েকটি সীমান্তপথে যাত্রী চলাচল অব্যাহত থাকলেও শত শত থেকে প্রায় দুই হাজার ট্রাক আটকা পড়েছে। এসব ট্রাকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), চাল, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।
পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গাবদ-রিমদান পথটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ইরান থেকে পাকিস্তানের আমদানি করা দৈনিক প্রায় সাত হাজার টন পণ্যের মধ্যে চার হাজার টনেরও বেশি এলপিজি এই পথ দিয়ে আসত।
সীমান্তপথে বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানের বাজারেও। দেশটির কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ রুপি থেকে বেড়ে ৭ হাজার রুপি বা তারও বেশি হয়েছে।
শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য সব নিষেধাজ্ঞাব্যবস্থা মেনে চলে এবং ভবিষ্যতেও মেনে চলবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ইরাকেও বন্ধ গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ
এদিকে ইরাকের মাইসান প্রদেশের ব্যস্ত শিব সীমান্তপথটি গত ২১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত যাত্রী, যানবাহন ও বাণিজ্যিক ট্রাক চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং নিষিদ্ধ সামগ্রীর চোরাচালান ঠেকাতে শনাক্তকরণ সরঞ্জাম স্থাপনের জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাগদাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর চাপের সম্পর্ক দেখছে। ইরানের প্রবেশাধিকার সীমিত করার পাশাপাশি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ড্রোন-সংশ্লিষ্ট তৎপরতা ও হামলার বিষয়ে আগেও উদ্বেগ জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।
প্রতিবেদনগুলোতে ইরাকের আরও কয়েকটি সীমান্তপথ ধাপে ধাপে বন্ধ করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। যদিও কিছু বাণিজ্যপথ এখনো চালু রয়েছে।
চাপে ইরানের স্থলবাণিজ্য
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ এবং বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে স্থলপথে বাণিজ্যের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর মতো ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও চাপে ফেলেছে।
কিছু ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সরকারি পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও সীমান্তে বিঘ্নের প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ, পচনশীল পণ্য এবং তৃতীয় দেশে পরিবহনযোগ্য পণ্যের ওপর পড়ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং সীমান্তের উভয় পাশে ট্রাক আটকে থাকছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ইরান ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, শিব সীমান্তপথ বন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা ইরাকের অভ্যন্তরে প্রতিবাদ করছেন।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান ও ইরাকের সীমান্তসংক্রান্ত পদক্ষেপ ইরানের স্থলবাণিজ্যের ওপর নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রকৃত ভূমিকা এবং সীমান্তপথগুলো কত দিন বন্ধ থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
