ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ফন্ট সাইজ:

মরহুম ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন বাংলাদেশের আইন অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রতিথযশা আইনজীবী, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক। তিনি ছিলেন দল ও মতের ঊর্ধ্বে থাকা সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী। এমন ব‍্যক্তিত্ব আইনাঙ্গন তো বটেই, গোটা বাংলাদেশেও বিরল। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রাজনৈতিক সংকটের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভূমিকা পালন করেন। আইন পেশার পাশাপাশি তিনি বহু জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজসেবায় অনন্য অবদান রাখেন । এগুলো তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে চিরকাল।

ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৩৩ সালের ২রা নভেম্বর অবিভক্ত ভারতবর্ষের কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুমিন-উল হক ছিলেন চিকিৎসক ও মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হকের বাল্যকাল কাটে কলকাতায়। কলকাতায় অবস্থিত চেতলা বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তোর তথা এমএ ডিগ্রি এবং ১৯৫৮ সালে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্যর ঐতিহ্যবাহী লিংকন্স ইন থেকে ব‍্যারিস্টার হোন।

১৯৬০ সালে ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক কলকাতার উচ্চ আদালতে আইনজীবী হিসেবে আইনপেশা শুরু করেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে এনরোল্ড হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক তাঁর কর্মজীবনে হাজার হাজার মামলায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে তাঁর প্রায় ৫০০টি বেশি মামলা রিপোর্টেড (আইন-সাহিত্যে প্রকাশিত) হয়েছে। কর্পোরেট ও কোম্পানি আইনে তিনি ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বিভিন্ন খসড়া আইন তৈরিতে কাজ করেন, যার মধ্যে একটি আইন ছিল ১৯৭২ জাতীয়করণ আদেশ (Nationalisation Order 1972)। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৭-৮১) তিনি এই আদেশ বাতিলের জন্য খসড়া আইন তৈরিতে কাজ করেছিলেন। এছাড়া তিনি ওই সময় আরো বেশ কিছু আইন সংস্কারের খসড়া তৈরি করেন।

তিনি ১৯৭৫-১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে এবং বার কাউন্সিলের নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৭৭ সালে কোম্পানী আইন সংস্কার কমিটির সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এবং বেসরকারী বিনিয়োগ সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের আইন ড্রাফট ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে তিনি মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের শেয়ার বাজার উন্নয়ন কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে দায়িত্ব পালন করেন।

ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক এশিয়ার জন্য ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শাখা’ (ICC) এবং আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে (UN General Assembly) বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এছাড়াও তিনি বিশ্ব আইনজীবী সমিতির আন্তর্জাতিক কর সংক্রান্ত নির্বাহী কমিটি এবং বিশ্ব নির্বাহী কমিটির নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক সবসময় সোচ্চার ছিলেন। পতিত সরকারের সময় সাহস করে উচ্চারণ করেন “আদালত হাওয়া দেখে রায় দেয়”। উচ্চ আদালতকে সহায়তা করার জন‍্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে বহু মামলায় তাঁকে অ্যামিকাস কিউরি (Amicus Curiae) বা 'আদালতের বন্ধু' হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া জেলা জজ ও যুগ্ম জেলা জজদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত 'জাজেস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট'-এ তিনি নিয়মিত খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করতেন।

২০০৬-২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) বাংলাদেশের দুই শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী—আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া—উভয়ের পক্ষেই তিনি আদালতে আইনি লড়াই করে সাড়া জাগিয়েছিলেন। শুধু এই দুই নেত্রীর মামলাই নয় বরং আরও অনেক শীর্ষ রাজনীতিবিদের পক্ষেও মামলা লড়েছিলেন। এই জটিল ও সংবেদনশীল মামলাগুলোর সিংহভাগই তিনি পরিচালনা করেছিলেন সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে (বিনামূল্যে), যা পেশাদারত্বের ঊর্ধ্বে উঠে আইন পেশাকে এক মহান মর্যাদায় আসীন করেছিল।

ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৮৬ সালে ক্যান্সার থেকে বেঁচে যান এবং এরপর থেকে দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নতিতে অবদান রাখতে শুরু করেন। আইনপেশার পাশাপাশি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একজন বড় মাপের দানবীর ও সমাজসেবক ছিলেন। তিনি আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ও আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে সুবর্ণা ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া তিনি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সুবর্ণা মসজিদ ও ১০০ শয্যার হাসপাতাল, আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালসহ প্রায় ২৫টিরও বেশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাকরণে সহায়তা করেন। এছাড়া তিনি বারডেম জেনারেল হাসপাতালের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের নুরজাহান ওয়ার্ডের এবং আদ-দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সভাপতি ছিলেন।

মানবসেবা ও কর্মক্ষেত্রের স্বীকৃতিস্বরূপ ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক বহু পুরস্কারে ভূষিত হন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ স্বর্ণপদক; মার্কিন সেনেট কর্তৃক কলকাতার মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক; ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল কর্তৃক প্রশংসা পুরস্কার; মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর পৃষ্ঠপোষক পুরস্কার; স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি অবদানের জন্য এমসিসিআই কর্তৃক এবং ঢাকা দক্ষিণ লায়ন্স ক্লাবের রোটারি ক্লাব কর্তৃক পুরস্কার।

আমার সাথে ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। লন্ডন ও ঢাকায় একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। লন্ডনে তাঁকে নিয়ে প্রোগ্রাম করেছি। আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাঁর সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দেশে ফিরে আইনপেশায় মনোনিবেশ করার জন‍্য আমাকে উৎসাহ দিতেন। তাঁর একটি বড় গুন ছিল - তিনি স্পষ্টবাদি ব‍্যক্তিত্ব ছিলেন। যা বলতেন ও ভাবতেন রাখঢাক না করে সোজা বলে দিতেন, সেটা প্রাইভেটলি হোক বা উচ্চ আদালতের এজলাসেই হোক।

ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৬০ সালে ডাক্তার ফরিদা হককে বিয়ে করেন। এই দম্পতির এক ছেলে রয়েছে, নাম ফাহিম-উল হক, যিনি কানাডায় বসবাস করেন ও পেশায় একজন ব্যারিস্টার। ২০১১ সালে তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতে অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ঢাকার পুরানা পল্টনের "সুবর্ণা" নামক নিজ বাসভবনে শেষ বয়সে তিনি বই-জার্নাল পড়ে এবং হুইলচেয়ারে বসে সময় কাটাতেন। ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর ৮৪ বছর বয়সে আদ-দ্বীন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই মহান ব্যক্তিত্ব শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ব‍্যারিস্টার রফিক-উল হক তাঁর পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা এবং আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত জীবন আজীবন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: [email protected]