ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি ঢাকার বাইরে

ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি ঢাকার বাইরে

ফন্ট সাইজ:

ডেঙ্গুর থাবা গ্রাস করেছে সারা দেশেই। ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমের রোগ নয়। বছর জুড়েই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এ বছর ঢাকা সিটির চেয়ে ঢাকার বাইরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও প্রাণহানি বেশি। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেয়। সরকারি হিসাবে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু গত বছরকেও হার মানিয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ৩৭১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে মারা গেছেন ২১৬ জন এবং রাজধানীতে রয়েছেন ১৫৫ জন। আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ৯৩ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২৯৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর ১লা জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৩৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মহানগর ব্যতীত ঢাকা জেলার অন্য জেলায় মারা গেছেন ২৩ জন, খুলনা বিভাগে ৬৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩০ জন, বরিশাল বিভাগে ২৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৩ জন, রংপুরে ৭ জন ও সিলেট বিভাগে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। মোট আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৩ হাজার ৬১৬ জন এবং ঢাকা মহানগরে ২৬ হাজার ১৮৫ জন।

অন্যদিকে, সরকার গত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান শুরু করে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১২ই সেপ্টেম্বর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কিন্তু তাতে ভালো ফল আসছে না।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আশা করার মতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হতাশার চিত্রটাই বেশি। এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহর নয়, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে এডিস মশার প্রজনন কীভাবে হচ্ছে, তা জানতেই পারছি না। অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি, সেটা ভুল। এ পদ্ধতিতে ২০০০ সাল থেকে কার্যক্রম চালিয়েও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। সারা দেশে কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ দরকার। গ্রামের মানুষকে এ বিষয়ে আরও সচেতন করা প্রয়োজন।

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু ভালো প্রযুক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করবে, সে রকম দক্ষ জনবল নেই। এসব প্রযুক্তি প্রয়োগে প্রধান হচ্ছে কীটতত্ত্ববিদ ও তাদের সহযোগী। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশনে কীটতত্ত্ববিদ আছেন মাত্র দু’জন। তারাও সেইভাবে ফোকাসড কাজ করে না। ফলে বিগত সময়ে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখন আমাদের অনেক কীটতত্ত্ববিদ, তাদের সহযোগী, টেকনিশিয়ান, ল্যাবরেটরি ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দরকার। তাহলে জানা যাবে এসব প্রযুক্তি কাজ করছে কি করছে না, কোথায়, কখন, কী পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে। দক্ষ জনবল ছাড়া এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব না। ফলে ডেঙ্গু আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে যাবে। তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন আছে ফগিং ও লার্ভিসাইট নিয়ে ব্যস্ত। তারা এর চেয়ে বেশি কিছু করতে জানে না। আমরা বারবারই বলছি, কোনো একটা মেথড দ্বারা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যেটিকে আমরা বলি ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট (আইভিএম)। অর্থাৎ অনেকগুলো পদ্ধতি একসঙ্গে প্রয়োগ করা। যখন যেখানে যেটি দরকার, সেটি প্রয়োগ করা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই মডেলের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে- এটা আগেই বলেছিলাম। তবে নভেম্বরে কিছুটা কমতে পারে পরিস্থিতি। অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এডিস মশা শুধু দিনের বেলাতেই নয়, রাতেও মানুষকে কামড়ায়। তিনি আরও বলেন, যেসব জায়গায় এডিস মশা বেশি সেখানে টার্গেট করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে হচ্ছে সরকারের উদ্যোগগুলো ভালো কাজ দিচ্ছে না। ফলে ফলাফল আসছে না। মনে হচ্ছে জনগণ সম্পৃক্ত হচ্ছে না। এ ব্যাপারে জনগণ সিরিয়াস না। জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে পরিকল্পনার অভাব নেই। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের বারবার বাস্তবায়নহীন পরিকল্পনার কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও প্রাণ হারাচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া হয়েছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে, একের পর এক কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। কখনো গাপ্পি মাছ দিয়ে মশার লার্ভা ধ্বংসের উদ্যোগ, কখনো বন্ধ্যা পুরুষ মশা ছেড়ে প্রজনন কমানোর পরিকল্পনা, আবার কখনো ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত ভালো মশা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি লার্ভিসাইড, অ্যাডাল্টিসাইড, ফগিং, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, এডিস জরিপ ও ক্র্যাশ প্রোগ্রাম সবই চলছে। কিন্তু কোনো পরিকল্পনাই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না। এসব পরিকল্পনা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজে আসেনি।

দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছর দেশের ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়, যা আগের ২৩ বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যার চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে এককভাবে ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। যা আগের বছরগুলোর মোট মৃত্যুর (৮৪৯ জন) চেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে মৃত্যু হয় ৩২৩ জনের। এ বছর মৃত্যু আগের বছরের মোট মৃত্যুকে ইতিমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে।