বাংলাদেশে দুর্গাপূজার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এই সাফল্য ধরে রাখা তার জন্য সহজ হবে না। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চাপ—সব মিলিয়ে সামনে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারেন তিনি।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গ, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশেও দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনের এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় বিশ্বাস।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর তারেক রহমানের অধীনে এটিই ছিল প্রথম দুর্গাপূজা। উৎসবের আয়োজন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সরকারি সহযোগিতার কারণে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়েছেন। এমনকি তার রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ উৎসবের আয়োজনের প্রশংসা করেছেন।
তবে এই নতুন রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে হলে তাকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
জাঁকজমকপূর্ণ পূজা, নজিরবিহীন নিরাপত্তা
এ বছর বাংলাদেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ছিল ২৫৮টি। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দেড় হাজার মণ্ডপ বেড়েছে। উৎসব ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দেশজুড়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ সদস্যকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি মণ্ডপে আটজন এবং অন্য মণ্ডপগুলোতে ছয়জন করে সদস্য মোতায়েন করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আরও ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া সীমান্তবর্তী আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা প্রায় ১ হাজার ৮০০টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন করে এবং টহল জোরদার করে।
সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করে। এর পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কার্যত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান সরকারি চাকরিজীবীরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসার ঝড়
নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও মফস্বলে পূজামণ্ডপের বর্ণাঢ্য আয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।
ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান লিখেছেন, বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এত জাঁকজমক ও প্রাণবন্তভাবে উদ্যাপিত হতে তিনি আগে কখনো দেখেননি।
ডেইলি ওয়াদার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের দুর্গাপূজার আয়োজনের প্রশংসা করেছেন লেখক, অধিকারকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। তাদের মতে, বিএনপি সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় হিন্দু সম্প্রদায় বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন করতে পেরেছে।
লেখক ও অধিকারকর্মী সাদিকুর রহমান খান, চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং লেখক ফাহাম আবদুস সালাম উৎসবের প্রশংসা করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, আগের বছরগুলোতে উৎসব ঘিরে যে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ছিল, এবারের আয়োজন তার থেকে আলাদা।
কলকাতার সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের প্রশংসাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে তিনি নিয়মিত সরব ছিলেন।
এবার ফেসবুকে তিনি লিখেন, ‘এ বছর বাংলাদেশে দুর্গাপূজা ছিল অসাধারণ। বাংলাদেশকে অভিনন্দন। চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের জাঁকজমক দেখে আমি বিস্মিত। কলকাতার পূজামণ্ডপগুলোকে যারা পুরস্কার দেয়, তাদের চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর জন্য আলাদা পুরস্কারের ব্যবস্থা করা উচিত। কুরিয়ারে ট্রফি পাঠিয়ে দিন।’
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি
দুর্গাপূজার আয়োজন তারেক রহমান সরকারের জন্য প্রশংসা বয়ে আনলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
উৎসব শুরুর আগে চলতি মাসে দেশজুড়ে পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি।
সংগঠন দুটি সারা বছর ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের হিন্দু অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকার দ্য প্রিন্ট-কে বলেন, গ্রামপর্যায়ে হুজুর ও অন্যান্য ইসলামপন্থী ধর্মীয় বক্তাদের কেউ কেউ এ বছরও প্রতিমা পূজার বিরোধিতা করেছেন। তারা একে ‘হারাম’ আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের দুর্গাপূজার আয়োজনে অংশ না নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে তার অভিযোগ।
জয়ন্ত কর্মকার বলেন, ‘তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পরও বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা মাঠপর্যায়ে হিন্দুদের বাস্তব পরিস্থিতি বদলে দেয় না। হিন্দুবিদ্বেষী বক্তব্য ছড়ানো ইসলামপন্থী বক্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
হিন্দু ভোট ধরে রাখাই হবে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের হিন্দু ভোটারদের বড় একটি অংশ তারেক রহমানের বিএনপিকে সমর্থন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতার বাইরে রাখার বিষয়টিও এই রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দুর্গাপূজার সফল আয়োজন আপাতত হিন্দু ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে তারেক রহমানের সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে। তবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এই সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সত্যিই ফিরলে হিন্দু ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির কাছ থেকে আবার আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকবেন কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুর্গাপূজার সময় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেয়া বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এসেছেন।
মন্দির কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে অবৈধভাবে দখল হওয়া মন্দিরের জমি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবেন। মন্দির কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের নথিভুক্ত প্রায় আট একর জমির মধ্যে আনুমানিক ৫ দশমিক ৬ একর অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে।
পাটওয়ারীর এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের কিছু হিন্দুর মধ্যে সাড়া ফেলেছে। ফলে আগামী নির্বাচনে হিন্দু ভোট ধরে রাখতে তারেক রহমানকে আরও বেশি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সামনে আরও কঠিন পথ
এবারের দুর্গাপূজা আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান সরকার সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিয়েছে। তবে উৎসবের জাঁকজমক দিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থা ধরে রাখতে হলে সারা বছর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে।
একই সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা এবং সংখ্যালঘুদের ভোটের হিসাব তারেক রহমানের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এ মুহূর্তে জাঁকজমকপূর্ণ ও মোটামুটি শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা তার সরকারের জন্য ইতিবাচক দিক। কিন্তু এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা, তা নির্ভর করবে উৎসবের বাইরেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
লেখক: দীপ হালদার একজন লেখক এবং দ্যপ্রিন্ট-এর সহযোগী সম্পাদক
