সৌদি যুবরাজ, আমিরাতের শাসক ও নেতানিয়াহুকে ঘিরে গোপন লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

ট্রাম্পের জামাতার ফোন হ্যাক

সৌদি যুবরাজ, আমিরাতের শাসক ও নেতানিয়াহুকে ঘিরে গোপন লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরাইলের নেতাদের সঙ্গে গোপন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ভ্যানিটি ফেয়ার সাময়িকীর এক নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কুশনারের আইফোনের কার্যক্রম গোপনে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন ডাচ গোয়েন্দারা। এ সময় তারা কয়েকটি গোপন আর্থিক ব্যবস্থার তথ্য পান, যার মাধ্যমে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা।

তবে কুশনার এসব অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষায়, অভিযোগগুলো ‘আপত্তিকর’ এবং ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে কুশনার বলেন, ‘এসব ভয়াবহ বানোয়াট কাহিনিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এটি সাংবাদিকতা নয়। বরং কল্পনা, কথাসাহিত্য ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণার মিশ্রণ।’

যেসব অভিযোগ উঠেছে

ম্যাথিউ কোলের আসন্ন বই প্রিন্সেস অ্যান্ড থিভস: জ্যারেড কুশনার অ্যান্ড মোহাম্মদ বিন জায়েদের সিক্রেট প্লট টু রিমেক দ্য মিডল ইস্ট থেকে নেয়া একটি অংশের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ভ্যানিটি ফেয়ার।

প্রতিবেদনটির দাবি, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় ডাচ গোয়েন্দারা গোপনে কুশনারের আইফোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের তথ্য পান। ওই হিসাবে আজারবাইজানের একটি ব্যাংক থেকে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার জমা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকে ওয়াতানি আল এমারাত ফাউন্ডেশনের নামে থাকা একটি হিসাবে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করা হয়েছিল। সংস্থাটি সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। কুশনার ওই ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষরদাতা ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হিসাবটি ব্যবহারের সুযোগ তার ছিল, যদিও তিনি এর মালিক ছিলেন না।

হিসাবটি তদারক করতেন তাহনুন বিন জায়েদ। তিনি ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদের ভাই।
প্রতিবেদনটির দাবি, ওই হিসাব খোলার ধারণার পেছনে ছিলেন তাহনুন বিন জায়েদ ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য তারা একটি গোপন তহবিল গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই তহবিল গঠনের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই প্রভাবশালী রাজপরিবারের সদস্য কুশনারের জন্য দুটি হিসাবে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার জমা দিয়েছিলেন।

কুশনারের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য এক বিলিয়ন ডলার?

প্রতিবেদনে আরও একটি ব্যাংক হিসাবের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সৌদি রাজপরিবারের এক সদস্য কুশনারের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ওই হিসাবে এক বিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করেছিলেন।
প্রতিবেদনের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এই অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেছিলেন। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কুশনারকে অর্থটি ইসরাইলের কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত লেনদেন নিয়ে কুশনার নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তৎকালীন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যানের মাধ্যমে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিবেদনটিতে উত্থাপিত দাবিগুলোকে কোনো অপরাধ বা অন্যায়ের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

অভিযোগে উল্লিখিত লেনদেনগুলো ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সংঘটিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সী কুশনার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ট্রাম্পের অনানুষ্ঠানিক শান্তি উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্পের স্বামী।

‘সম্পূর্ণ পাগলামি ও বানোয়াট’

এক্সে দেয়া পোস্টে কুশনার অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ পাগলামি’ বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, এ ধরনের কোনো ঘটনা কখনো ঘটেনি।

তিনি লিখেন, ‘আমরা এসব অভিযোগের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছি। অথচ লেখক এগুলোর সত্যতা প্রমাণের জন্য সামান্যতম প্রমাণও হাজির করতে পারেননি। এসব অসাধারণ অভিযোগের সমর্থনে কোনো ব্যাংক বিবরণী, অর্থ স্থানান্তরের নথি, হিসাব নম্বর, লেনদেনের তারিখ কিংবা যাচাইযোগ্য অন্য কোনো তথ্য দেয়া হয়নি।’

কুশনার আরও বলেন, যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নজরদারির মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের একজন। সংবাদমাধ্যমের তীব্র অনুসন্ধান, কংগ্রেসের একাধিক তদন্ত এবং বিশেষ কাউন্সেলের তদন্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি।

কুশনারের ভাষায়, ‘আমি স্বেচ্ছায় এসব তদন্তে সহযোগিতা করেছি এবং ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় সাক্ষ্য দিয়েছি। এসব অভিযোগ কখনো সামনে আসেনি, কারণ এ ধরনের কোনো ঘটনাই কখনো ঘটেনি।’

আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি

কুশনারের আইনজীবী চ্যাড মিজেলও প্রতিবেদনটির অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। এক্সে দেয়া পোস্টে তিনি লিখেন, ‘এগুলো ব্যাখ্যার পার্থক্য কিংবা পরস্পরবিরোধী স্মৃতির বিষয় নয়। এমন কোনো ব্যাংক হিসাবই নেই। সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। কোনো প্রমাণ ছাড়াই এমন গুরুতর ও মানহানিকর অভিযোগ তোলা হয়েছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি মামলা করবেন?’ এর জবাবে মিজেল বলেন, ‘সব ধরনের বিকল্পই বিবেচনায় রয়েছে।’

সূত্র: ভ্যানিটি ফেয়ার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন