ইরানের ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশল ও মার্কিন সতর্কতা, যুদ্ধ কি আসন্ন?

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরানের ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশল ও মার্কিন সতর্কতা, যুদ্ধ কি আসন্ন?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ববাসীর জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ। কার্যকর কোন সমাধান না আসায় সংকটে পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই একে অপরের প্রতি হুমকি বজায় রেখেছে। নাগরিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সতর্কতা জারি করছে যুক্তরাষ্ট্র। বাড়াচ্ছে সামরিক উপস্থিতি।

অপরদিকে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তাদের ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশলের অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করবে তেহরান এবং মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানবে। বুধবার আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘আমাদের আগের প্রতিরক্ষামূলক নীতি ছিল, আক্রান্ত হলেই কেবল জবাব দেবো। কিন্তু এখন আমরা বলছি, কেউ আমাদের ওপর হামলা চালালে আমরা শুধু জবাবই দেবো না, পাল্টা আক্রমণও চালাবো।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অব্যাহত হামলা এবং আট মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই সতর্কবার্তা এলো। এদিকে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরব থেকে কিছু কূটনৈতিক কর্মীকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সংঘাত নিয়ে খুব শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।
আইআরজিসি মুখপাত্র মোহেবি জানায়, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ বেড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গুণমান, পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ইরানি বাহিনী ‘ফাদার অব অল বোম্বস’ বা সব বোমার জনক উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

হরমুজ প্রণালিতে হামলার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সম্প্রতি এই জলপথে হামলা ও ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি সমর্থিত সরকারের লড়াইয়ের ফলে তেলের দাম আবারও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন কৌশল ভবিষ্যতের কোনো মার্কিন-ইসরাইল হামলাকে আরও ব্যয়বহুল করার লক্ষ্যেই নেয়া হয়েছে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে জানান, আগের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর তেহরান এখন নতুন সমীকরণ দাঁড় করাতে চায়। প্রচলিত মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে পেরে না ওঠায় ইরান ক্রমশ তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগাচ্ছে। আরব সেন্টারের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো রামি খৌরি জানান, ইরানের এই কৌশল সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে দিতে পারে, যা শক্তি সরবরাহ, পরিবহন ও পণ্য চলাচলে বিঘ্ন ঘটাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য বেশ বিভ্রান্তিকর। বুধবার তিনি বলেন, ওয়াশিংটন আর তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না এবং খুব শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

তবে নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতিও তিনি আগে দিয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম কোনো চুক্তিতেও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেবে না বলে জানান তিনি। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সাত দিনের একটি পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিনিময়ে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে তারা।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রোববার আবারও ইরানের সরকার পতনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, যেকোনো সময় নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নির্বাচন সামরিক পদক্ষেপের সময় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ইরানও স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ওপর যেকোনো হামলার চড়া মূল্য দিতে হবে।