সার সমস্যা সমাধানে উপকরণ ডিলার কন্ট্রোল অর্ডার প্রশিক্ষণ

সার সমস্যা সমাধানে উপকরণ ডিলার কন্ট্রোল অর্ডার প্রশিক্ষণ

ফন্ট সাইজ:

এটা কৃষির গুরুত্ব প্রাপ্তির জন্য ‘‘যারপরনাই” আশাজনক যে, দেশের শিক্ষিত মহিলা ও রাজনীতিকসহ সর্বস্তরের মানুষ সার ডিলার হওয়ার জন্য আগ্রহী হয়েছে। ক্ষমতাবানের আশ্বাস ও সুপারিশ নিয়ে আবেদন করেছে, পয়সা খরচ করে তদবির করছে। আগে ভর্তুকিবিহীন কৃষি উপকরণের ব্যবসা করার এত আগ্রহ দেখা যায় নাই।

তবে আবেদনের সংখ্যা ও তদবিরের মাত্রা এত বেশি হওয়াতে সরকারের ডিলার মনোনয়নে ব্যাপক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। কাজটি সুচারু করার জন্য যে আইন রয়েছে তার নাম বাংলাদেশ সার (ব্যবস্থাপনা) আইন ২০০৬, আইন সংখ্যা ঠও/২০০৬; সংশোধনী- বাংলাদেশ সার (ব্যবস্থাপনা) (সংশোধনী) আইন ২০১৮, বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন প্রণীত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৪-২৫। সমস্যাটি জটিলতাপ্রাপ্ত হয়েছে এখানেই, আইনের ভেতরে উদারনৈতিক ব্যবস্থাপনা” কথাটি থাকার কারণে। কারণ ব্যবস্থাপনা কথাটি সারের বৈজ্ঞানিক কারিগরি বিষয়গুলোকে অনেক দুর্বল করে ফেলেছে। ভারতে এই আইনের নাম ফার্টিলাইজার কন্ট্রোল অর্ডার (ঋঈঙ) অ্যাক্ট ১৯৮৫, এসেন্সিয়েল কমোডিটি অ্যাক্ট সম্পর্কিত, এখানে ব্যবস্থাপনা কথাটির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ আদেশ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় এর নাম ‘রেগুলেশন অর ফার্টিলাইজার অ্যাক্ট নং ৬৮-১৯৮৮। পকিস্তানে রয়েছে প্রদেশ ভিত্তিক ফার্টিলাইজার কন্ট্রোল অর্ডার অ্যাক্ট। এশিয়াসহ বিশ্বের কোনো কৃষি দেশেই সার আইনে ব্যবস্থাপনা কথাটি নাই, আছে কন্ট্রোল অর্ডার।

বাংলাদেশের সার আইনে কন্ট্রোল অর্ডার-এর কারিগরি বিষয়াবলী স্পষ্টীকরণ না করাতে বিগত দশকগুলোতে বিস্তর অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। ষাটের দশকে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ সার ডিলারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করতো। আমি নিজে সেখানে সরকারিভাবে প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নিয়ে কাজ করেছি। আশির দশকে বিএআরসি প্রণীত ফার্টিলাইজার রিকোমেন্ডেশন গাইড-এর ভিত্তিতে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে সার ব্যবহার নির্দেশনা পুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশনা করেছি যা এখনো মাঠ পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমার লেখা গুড গভর্নন্সেস পুস্তকে ও জাতীয় পত্রিকায় সার ব্যবহারের বিস্তারিত ২০টির অধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সে পরিস্থিতি বদলে গেছে। মন ও জন-চাহি ব্যবস্থাপনার আড়ালে কৃষি উপকরণ ও সার ব্যবসায়ী, সার ডিলার-সাবডিলার বিক্রেতা মিলে মোট ডিলারের জাতীয় সংখ্যা হয়ে গেছে প্রায় লক্ষাধিক। সার ও যন্ত্রপাতিতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা সরকারি ভর্তুকি। এই লক্ষাধিক ডিলার-মানবের চাহিদা মিটাতে কৃষি বিভাগ ও কৃষক উভয়েই অসহায়তা প্রকাশ করছে। এর প্রেক্ষিতে দেশের সার সংস্থা ও ডিলারের জটিল ডাইনামিক্স তুলে ধরা হলো। তারপর কয়েকটি প্রধান সুপারিশ উল্লেখ করা হলো।

বাংলাদেশে বার্ষিক ষাট লক্ষাধিক টন মোট সার এবং ২৮ লাখ টন ইউরিয়া ব্যবহৃত হয় যার মধ্যে কমপক্ষে প্রায় ৮০% আমদানি করতে হয়। ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা মান গড়ে ৩৫%। নাইট্রোজেন সার ব্যবহার কার্যকারিতা ইউএসএ ৬৫% (অ-ধান) ১০৮ কেজি/হে। বিশ্বগড় ৫৫%. (১৫৩ কেজি/হে। ভারত ৪২%, ১৮২ কেজি/হে। বাংলাদেশ ৩৫%, ৩৯২ কেজি/ হে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত সারের প্রায় ৮০% ধানে প্রয়োগ হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫% কৃষক রাসায়নিক সার ব্যবহার করে। দেশে নতুন বিধিমালায় প্রতিটি ইউনিয়নে ৩ জন হিসেবে ডিলার হতে পারে প্রায় ১৩ হাজার জন।

দেশে পেস্টিসাইড ডিলারের সংখ্যা কতো তা পার্থক্যপূর্ণ। তবে বলা যায় প্রায় ৯০০ পেস্টিসাইড কোম্পানির ১ হাজার পেস্টিসাইড আমদানিকারক, ২২টি স্থানীয় প্রস্তুতকারক ও ১২০০০ ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রয়ে প্রতি ইউনিয়নে গড়ে ৩ জন হিসেবে ১৫ হাজার পেস্টিসাইড বিক্রেতা রয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি ডিলার হতে পারে ৩ থেকে ৫ হাজার। দেশে ৫০-৬০টি কোম্পানি, হাজার খানেক গ্রুপের ১২ হাজার জন উদ্যোক্তা (এমটিসিপি ২ এবং কোস্ট ট্রাস্ট সূত্রমতে) ভার্মিকম্পস্ট সগ বিভিন্ন জৈব সার উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
সার্বিকভাবে সারা দেশে ১১০০০ রেজিস্ট্রিকৃত প্রাথমিক ডিলার (৫৮০০ বিসিআইসি ও ৫২০০ বিএডিসি) এবং ৪৫ হাজার খুচরা সার বিক্রেতা ব্যবসা কাজে জড়িত রয়েছে। দেশে বিএডিসি’র প্রায় ১১ হাজার বীজ ডিলার রয়েছে ও ১০০ বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। সঙ্গে বেসরকারি প্রায় ১০০ বীজ কোম্পানির ৫০০০ রেজিস্ট্রিকৃত বীজ ডিলার রয়েছে। বাংলাদেশ সীড এসোসিয়েশনের সারা দেশে এফবিসিসিআই অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি ইউনিট রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৮০% ডিলারের সার-পেস্টিসাইড-বীজ-যন্ত্রপাতির মিশ্র সমন্বিত ব্যবসা দোকান রয়েছে। উপকরণ ব্যবসায়ী নেতৃত্বে রয়েছে বিএফএ বা বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন। কৃষি উপকরণ ব্যবসা বর্তমান বাজার হিসেবে বীজ ১০ হাজার কোটি টাকা, সার ও রাসায়নিক ১৫ হাজার কোটি টাকা, পেস্টিসাইড ৮ হাজার কোটি টাকা এবং যন্ত্রপাতি ১২ হাজার কোটি টাকা মোট ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
দেশে সকল ইনপুট ডিলারের মধ্যে বহুমুখী উপকরণ ৭০% নিয়ন্ত্রণকারী হতে পারেন সর্বমোট একক হিসেবে প্রায় লক্ষাধিকের মধ্যে প্রতি জেলায় অন্তত ১৫ জন করে ১ হাজার জন, যারা মূলত দেশের উপকরণ ব্যবসা পরিচালনা করেন। এদের ইচ্ছার বাইরে কেউ উপকরণ ব্যবসায়ী হিসেবে টিকতে পারবে না।

উপরে উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায় সার নিয়ে দেশের কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপক অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে পড়েছে। সারের ভর্তুকি থেকে কৃষককে লাভবান করতে না পারলে এবং কৃষি উৎপাদন না বাড়লে ভর্তুকি বিষয়টাই চরম ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। ফলে সারের ডিলার হবে ‘‘যার পর নাই” অর্থাৎ ”ডিলারশিপ পেয়ে যাওয়ার পর আর নাই” সারের ডিলারশিপ পেয়েও ব্যবসা থেকে সরে যাবে। তাই সমস্যাটির গ্রহণযোগ্য মোকাবিলা হিসেবে সরকারি আন্তরিকতা সাপেক্ষে নিম্নরূপ পদ্ধতি গ্রহণ করে সার সমস্যার সমাধান করা যায়।

১. পলিসি হিসেবে বর্তমান সরকারি কৌশল মতে সকল কার্ড ইউনিফাই করার মতো সকল উপকরণের ডিলার ইউনিফাই করে একক তালিকা করতে হবে। ভারতে একক তালিকা করে দেশি (উঅঊঝও, ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন সার্ভিসেস ফর ইনপুট ডিলারস) কার্যক্রম দ্বারা সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। এই কার্যক্রম বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে, যদিও মিসনমার হিসেবে বিদেশি এজেন্সি অপরিকল্পিত চেষ্টা করছে।
২. অনতিবিলম্বে কমন তালিকার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে নতুন-পুরাতন মিলে স্থানীয় উপ-সহকারী কর্মকর্তাকে অ্যাটাচ করে শর্তসাপেক্ষে জামানত নিয়ে অস্থায়ীভাবে ২-৪ জন চুক্তিবদ্ধ বিক্রেতা মনোনয়ন দিতে হবে। শর্ত হলো তারা এই অস্থায়ী চুক্তি প্রথমবার নবায়ন করার পূর্বে পর্যায়ক্রমে উপকরণ বিষয়ে সম্মিলিতভাবে বিএফএ, বিএসএ বিসিপিএ ও সরকারি অর্থায়নে কৃষি অফিসে কারিকুলাম অনুসারে প্রথম ধাপে ন্যূনতম সময় প্রশিক্ষণ নিয়ে পাস সার্টিফিকেট হাতে পেতে হবে।
৩. বর্তমান ‘‘ফার্টিলাইজার (ব্যবস্থাপনা) (সংশোধনী) ২০১৮ আইনের” আইন অংশ অধিক প্রতিপালন করতে হবে। সার বিষয়ে কন্ট্রোল অর্ডার জারি করতে হবে।
এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই, কৃষি উপকরণের বর্তমান সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা শুরু করার বর্ণিত ৩টি সুপারিশ হতে পারে সর্বাধিক সফলতার দাবিদার।