কুমিল্লায় একের পর এক খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনায় অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই (জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর) জেলায় ১১১টি খুন ও ১৩৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া চাঞ্চল্যকর কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী তাজমিনের হত্যাকাণ্ড জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লা জেলায় ১১১টি খুন, ১৩৯টি ধর্ষণ, ২৩২টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১৪টি অপহরণ এবং ৩৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে জেলার ১৮টি থানায় বিভিন্ন অপরাধে মোট চার হাজার ৯৬৩টি মামলা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে পুরো জেলায় ১০৩টি খুন ও ১৪৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল।
অর্থাৎ, গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই খুনের সংখ্যা বেড়েছে। তবে ধর্ষণের সংখ্যা গত বছরের মোট ঘটনার কাছাকাছি পৌঁছেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৪টি খুন ও ১৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ১৭টি। ফেব্রুয়ারিতে ১২টি খুন, আটটি ধর্ষণ ও ১৯টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মার্চে খুন ১১টি, ধর্ষণ ৯টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ১৮টি। এপ্রিলে ১০টি খুন, ২০টি ধর্ষণ ও ২৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এপ্রিলেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। ২৫শে এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে এসে কুমিল্লার ঝাগুরঝুলি এলাকায় নামার পর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে তিনি নিহত হন। মে মাসে সর্বোচ্চ ১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে।
ওই মাসে ১২টি ধর্ষণ ও ২৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৬১২টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টিতে। ওই মাসে ১০টি খুন ও ২১টি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে। জুলাইয়ে ১০টি খুন, ২২টি ধর্ষণ ও ৩০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। আগস্টে খুনের সংখ্যা ছিল ১১, ধর্ষণ ১৭টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২১টি। ওই মাসেই দেবিদ্বার উপজেলা সদরে ফরিদা ইয়াসমিন নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তার মরদেহ টুকরা করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটে। ৭ই আগস্ট রাতে এ হত্যাকাণ্ডের পরদিন পাশের একটি ডোবা থেকে পলিথিনে মোড়ানো মরদেহের খণ্ড উদ্ধার করে পুলিশ। সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯শে সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ১৬টি খুন, ১৪টি ধর্ষণ ও ৩৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে ওই মাসে বিভিন্ন অপরাধে ৬৮১টি মামলা নথিভুক্ত হয়।
এ ছাড়া অক্টোবরের শুরুতে তাজমিন হত্যা নামে এক স্কুলছাত্রী হত্যার ঘটনায় ফের আলোচনায় আসে কুমিল্লা জেলা। গত ৪ঠা অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বের হয় সপ্তম শ্রেণির ওই ছাত্রী। ৮ই অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগৎপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এডভোকেট কাজী নাজমুস সাদাত বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীরগতি, একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, চিকিৎসা পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং সাক্ষী হাজির করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণেও সময় লাগে। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে সমস্যায় পড়েন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য আনার আগেই গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়।
পোশাকসহ অন্যান্য আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করায় ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেতেও সমস্যা হতে পারে। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য অল্প সময়ের মধ্যে উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে পুলিশ। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), এসআরবি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন অভিযানে দুই হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
