টুপটুপ ট্র্যাজেডির পর ইকো রিসোর্টে আতঙ্ক

টুপটুপ ট্র্যাজেডির পর ইকো রিসোর্টে আতঙ্ক

ফন্ট সাইজ:

বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন কাঠ-বাঁশের কটেজ, চারপাশে সবুজের সমারোহ, কাছে সাগর। এমন পরিবেশের টানে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে গড়ে ওঠা ইকো রিসোর্টগুলোতে ছুটে আসতেন পর্যটকরা। কিন্তু গত ১৭ই অক্টোবর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন সৌন্দর্যের চেয়ে নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভ্রমণকারীরা। কেউ খোঁজ নিচ্ছেন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কি না, কেউ যাচাই করছেন রান্নাঘরের অবস্থান। আবার কেউ আগাম বুকিং বাতিল করে খুঁজছেন বিকল্প আবাসন। ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা রাহুল-শম্পা দম্পতি বলেন, মেরিন ড্রাইভের কয়েকটি ইকো রিসোর্ট ঘুরে তাদের মনে হয়েছে, বাইরের সাজসজ্জার সঙ্গে ভেতরের পরিবেশ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থার মিল নেই। তাদের ভাষ্য, পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো অবকাঠামো থাকলেও অগ্নিনিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় চোখে পড়েনি।

পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের পর ভ্রমণকারীদের মধ্যে নিরাপদ আবাসন বেছে নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আসা ব্যক্তিরা রিসোর্টের নির্মাণসামগ্রী, বের হওয়ার পথ, রান্নাঘরের অবস্থান এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সম্পর্কে জানতে চাইছেন। কেউ কেউ বুকিংয়ের আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। তবে মেরিন ড্রাইভে পর্যটন অবকাঠামোর বিস্তার ঘটলেও এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় দেড় শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও দোকানপাটের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে এমন স্থাপনার সংখ্যা তিন শতাধিক।

এর বড় একটি অংশের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। সোনারপাড়া, পেঁচারদ্বীপ ও হিমছড়ি এলাকায় ঝাউবাগান ও প্যারাবন ঘেঁষে রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিন ব্যবহার করে তৈরি এসব স্থাপনার আকর্ষণীয় ছবি দিয়ে অনলাইনে পর্যটকদের টানা হচ্ছে। কিন্তু প্রচারণার আড়ালে অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কতোটা রয়েছে- তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোনেও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ১৩০ একর জমিতে বরাদ্দ দেয়া প্লটগুলোতে গত দেড় দশকে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন হোটেল। এসব ভবনের অনেকগুলো নির্মাণে প্রচলিত বিধিবিধান মানা হয়েছে কি না- তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, মেরিন ড্রাইভের রিসোর্টগুলোতে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্য বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মেরিন ড্রাইভে তারকা মানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের বৈধ অনুমোদন নেই। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেয়া হয়েছে।

আরও স্থাপনা সরজমিন পরিদর্শন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে ফায়ার সার্ভিসও। মঙ্গলবার থেকে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় বিভিন্ন রিসোর্ট ও স্থাপনায় ফায়ার লাইসেন্সের বিষয়ে নোটিশ দেয়া শুরু হয়েছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স শাখার কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার এক দিনেই অর্ধশতাধিক রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনায় নোটিশ দেয়া হয়েছে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের সহস্রাধিক রিসোর্টের মধ্যে মাত্র ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে। পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে নতুন নতুন রিসোর্ট গড়ে উঠলেও সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতোটা সম্ভব হয়েছে, টুপটুপ ট্র্যাজেডির পর সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।