সিলেট স্টেশন ক্লাবে সেদিন যা ঘটেছিল

সিলেট স্টেশন ক্লাবে সেদিন যা ঘটেছিল

ফন্ট সাইজ:

এক মিনিট ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল সিলেটে। ভিডিওটি ‘এলিট ক্লাব’ বলে পরিচিত সিলেট স্টেশন ক্লাবের। কয়েকজন সদস্য হাতাহাতি করছেন। মধ্যস্থতাও করছেন সিনিয়ররা। এমন ভিডিও গত দু’দিন ধরে ভাসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিও নিয়ে তোলপাড়। বিতর্কও তুমুল। পেছনের কারণ অজানা। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, নানা ঘটনা। এই ভিডিও ভাইরালের পেছনেও রয়েছে রহস্য। অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে। কয়েক গ্রুপে বিভক্ত স্টেশন ক্লাবের সদস্যরা। ভিডিও’তে ভেসে ওঠা ঘটনার বিচার হয়েছে সোমবার। এই বিচার নিয়ে ক্ষোভ আছে কারও কারও।

প্রতিবাদস্বরূপ ভিডিওটি ফের ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঘটনায় বিব্রত ক্লাবের সদস্যরা। স্টেশন ক্লাবের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ ও একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে পেছনের রহস্য। তারা জানিয়েছেন-ভিডিওটি বর্তমান সময়ের নয়। এক বছর আগের। তখন ঘটেছিল হাতাহাতির ঘটনা। ওই সময়ও ভিডিও ছাড়া হয়েছিল যোগাযোগমাধ্যমে। পুলিশ আমলে নিয়েছিল ঘটনাটি। স্টেশন ক্লাবে তদন্তে এসেছিল। পরে পুলিশের তদন্তও বেশি দূর এগোয়নি। তারা জানিয়েছেন-২০২৫ সালের নভেম্বরের ঘটনা। স্টেশন ক্লাবের কালচারাল রুম। বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন ক্লাব সদস্য সায়েক খান ও আব্দুল্লাহ আহমদ সহ কয়েকজন। একান্ত ব্যক্তিগত কথা নিয়ে তর্কে জড়ান সায়েক ও আব্দুল্লাহ। এক পর্যায়ে এটি রূপ নেয় হাতাহাতিতে। চেয়ার দিয়ে বাড়াবাড়ির ঘটনাও ঘটে। বিবাদ আটকাতে গিয়ে সিনিয়র সদস্য মাহবুব আহমদ মাটিতে পড়ে যান। ক্লাব সদস্য সাইফুদ্দিন খালেদ এগিয়ে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে এসব দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওটি ধারণ করেন ক্লাব সদস্য জাকির আহমদ। তখন ভিডিও ধারণ করতে নিষেধও করেন খালেদ। তবে ভিডিও ধারণকারী ক্লাব সদস্য তার সেই নিষেধের বিষয়টি মানেননি। ভিডিও প্রসঙ্গে গতকাল কথা হয় সাইফুদ্দিন খালেদের সঙ্গে। জানান, এক বছর আগের ঘটনা। তখন ভিডিও ধারণকারী ক্লাব সদস্য জাকির আহমদ ঘটনার পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটি ছেড়েছিলেন। ভিডিও’র সূত্র ধরে ডিবি পুলিশ এসে তদন্ত করে গেছে। তিনি জানান, ওইদিন ক্লাব সদস্য সায়েক ও আব্দুল্লাহ তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তর্কে জড়িয়েছিলেন। এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। তখন অনেকে উপরের তলায় স্নুকার খেলায় ছিলেন। চিৎকার শুনে এসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্ত করেন।

ক্লাবের সিনিয়র সদস্য মাহবুব আহমদও তখন সেখানে ছিলেন। ক্লাবের বর্তমান দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন-এ ঘটনায় বর্তমান সভাপতি সায়েকুর রহমান সাক্কু সহ দায়িত্বশীলরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আলোকে গত সোমবার ক্লাবের সভায় সায়েক খান ও ভিডিও ধারণকারী জাকির আহমদকে বিভিন্ন মেয়াদের সাসপেন্ড করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ আহমদের ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দ্রুতই তার উপর আরোপিত শাস্তি বৈঠকের মাধ্যমে জানানো হবে। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক ঘটনায় সাবেক সভাপতি শাহ মোশাহিদ আলীকেও সতর্ক করা হয়েছে।

তারা জানিয়েছেন- যারা প্রকাশ্যে হাতাহাতিতে জড়িয়েছে সে দৃশ্যটি দৃশ্যমান ছিল। যারা এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। আর যে সদস্য ভিডিও ধারণ করেছেন তিনি পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির কাছে সেটি স্বীকারও করেছেন। ফলে ক্লাবের গঠনতন্ত্র মেনে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে বলে জানান দায়িত্বশীল নেতারা। এদিকে ক্লাবের বর্তমান দায়িত্বশীলদের এ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক সভাপতি শাহ মোশাহিদ আলী। তিনি জানিয়েছেন- এক ঘটনায় দুইবার বিচার হতে পারে না। তিনি সভাপতি থাকার সময় কয়েক মাস আগে এ ঘটনার বিচার করে গেছেন। ঘটনায় এক সদস্যকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে হাতাহাতির ঘটনায় দ্বিতীয়বার ক্লাব সদস্যের যে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে সেটি অগঠনতান্ত্রিক। তাকেও সতর্ক করা হয়েছে। এ বিষয়টি তিনি ক্লাবের আগামী এজিএমে উপস্থাপন করলে ন্যায়বিচার পাবেন বলে জানান।

ক্লাবের পরিচালক ফাইন্যান্স সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- পূর্বের সভাপতি এ ঘটনায় যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন সেটি ক্লাবের কনস্টিটিউশনের গাইডলাইন ফলো করে করা হয়নি। এ কারণে বর্তমান কমিটি পুনরায় রিভিউ করে দোষীদের সতর্ক ও সাসপেন্ড করেছে। ক্লাবের স্বার্থে সব নিয়ম মেনে সেটি করা হয়েছে। তিনি বলেন- বর্তমান কমিটি নতুন করে সিদ্ধান্ত দেয়ার কারণে পূর্বের সেই ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ক্লাবের সদস্যরা জানিয়েছেন- ২০২৫ সালের নির্বাচনে সভাপতি পদে বর্তমান সভাপতি সায়েকুর রহমান সাক্কু ও সাবেক সভাপতি শাহ মোশাহিদ আলী সমান ভোট পান। এরপর ক্লাবের সদস্যরা দু’জনকেই ৬ মাস করে সভাপতির দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত দেন।

শাহ মোশাহিদ আলী ৬ মাস দায়িত্ব পালনের পর সহ-সভাপতিকে নিয়ে পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়। পূর্বের সিদ্ধান্ত মতো সায়েকুর রহমান সাক্কু দায়িত্ব নিলে বিরোধ আরও চাঙ্গা হয়। ওই সময় শাহ মোশাহিদ আলীর আবেদনের প্রেক্ষিতে স্টেশন ক্লাবের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও তিন মাস বন্ধ ছিল। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। ক্লাবের এই চলমান বিরোধ, সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি সহ নানা কারণে ভিডিও ভাইরাল সহ নতুন করে আলোচনায় আনা হয়েছে স্টেশন ক্লাবের কার্যক্রমকে। এ ব্যাপারে সিলেট স্টেশন ক্লাবের সভাপতি সায়েকুর রহমান সাক্কু মানবজমিনকে জানিয়েছেন- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফের ভিডিও ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। এরপর পরবর্তী কার্যক্রম চালানো হবে বলে জানান তিনি।