দুর্বলের ঘরে সিডিএ’র বুলডোজার প্রভাবশালীর মার্কেটে থেমে গেল অভিযান

দুর্বলের ঘরে সিডিএ’র বুলডোজার প্রভাবশালীর মার্কেটে থেমে গেল অভিযান

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) টানা দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে উঠেছে বৈষম্য, প্রভাব খাটানো ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। অভিযানে শতাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হলেও সিডিএ’র অধিগ্রহণ করা জমিতে অবস্থিত নূরনবী চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন বলে পরিচিত একটি বহুতল মার্কেট আংশিক ভাঙার পরও পুরোপুরি উচ্ছেদ করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, একই এলাকায় একের পর এক দোকানপাট, সীমানাপ্রাচীর ও অন্যান্য স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হলেও প্রভাবশালী পরিবারের এই বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে সিডিএ’র অবস্থান রহস্যজনকভাবে বদলে গেছে। প্রথমে উচ্ছেদ শুরু, পরে মাঝপথে অভিযান বন্ধ এবং এরপর জরিপের কথা বলে ভবন মালিককে একদিনের সময় দিয়ে কার্যক্রম স্থগিত- পুরো ঘটনাপ্রবাহে সংস্থাটির সিদ্ধান্ত ও অভিযানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মইজ্জ্যারটেকে সিডিএ’র উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম দিন নিয়মিত লিজে থাকা জমিতে পর্যাপ্ত নোটিশ ছাড়া অভিযান পরিচালনার অভিযোগ ওঠে।

পরদিন পূর্বঘোষিত দ্বিতীয় দিনের অভিযানে এলাকার দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি নূরনবী চেয়ারম্যানের বহুতল মার্কেটটিও সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়ার কথা ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। দ্বিতীয় দিনের অভিযানে অর্ধশতাধিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। তবে অভিযান শেষ হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা আগে বহুতল ভবনটিতে ভাঙার কাজ শুরু হলেও কিছু অংশ অপসারণের পর হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ভবনটির বাকি অংশও ভাঙা হবে। এর আগে ভবনের মালিকপক্ষ ও সিডিএ যৌথভাবে ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে করে পরদিন সকালে জরিপ প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদনে ভবনটি মালিকপক্ষের নিজস্ব জমিতে রয়েছে-এমনটি প্রমাণিত না হলে বৃহস্পতিবার পুনরায় অভিযান চালিয়ে স্থাপনাটি উচ্ছেদ করা হবে বলেও জানানো হয়। পরদিন কথামতো ভবনটিতে যৌথ ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম দেখা গেলেও এরপর আর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়নি। উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিডিএর জমিতে থাকা তাদের দোকানপাট হঠাৎ করে এসে ভেঙে দেয়া হয়েছে।

অথচ একই এলাকায় একটি বহুতল মার্কেট আংশিক ভাঙার পরও সেটি অক্ষত রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ উঠেছে, মহানগর বিএনপি’র কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার তদবিরে ভবনটি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের চেষ্টা চলছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে ভবনটির জমি বাণিজ্যিক লিজে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সিডিএ’র অভিযান শেষে মইজ্জ্যারটেক এলাকায় সরজমিন দেখা যায়, বহুতল ভবনটির কিছু অংশ ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, ভবন গুঁড়িয়ে দেয়ার খবরে আগে খালি করে ফেলা দোকানগুলোর ভেতরে আবার মালামাল নেয়া, সাজসজ্জার কাজ এবং নতুন করে ভাড়াটিয়া নিয়োগের কার্যক্রম চলছে বলে স্থানীয়রা জানান। এ বিষয়ে জানতে বহুতল ভবন মালিকের বড় ছেলে মো. মিরাজুন্নবী মিরাজ বলেন, এটি আরএস ও বিএস দাগে আমাদের রেকর্ডীয় সম্পত্তি। এইখানে সিডিএ আমার সঙ্গে এক ধরনের জুলুম করছে, এই জায়গার দাগে আমরা আদালত থেকে একটি নিষেধাজ্ঞাও এনেছি।

সব কিছু মিলিয়ে আমরা সিডিএ’কে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছি। মার্কেটটি পুনরায় ব্যবহারের জন্য সিডিএ কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবনটি আমাদের মালিকানা জায়গায় তাই এই ভবন ব্যবহারের জন্য সিডিএ’র অনুমতি প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসান জানান, ভবন কর্তৃপক্ষের অনুরোধে সিডিএ আবারও ডিজিটাল সার্ভে করে নিশ্চিত হয়েছে ভবনটি সিডিএ’র অধিগ্রহণ করা জায়গায় রয়েছে। শিগগিরই সিডিএ’র পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ বিষয়ে জানতে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের মুঠোফোনে কল দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা এখন কেবল একটি বহুতল ভবন উচ্ছেদ না হওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা, উচ্ছেদ অভিযানের স্বচ্ছতা এবং প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তৈরি করেছে।