চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়কগুলোতে কোনোভাবেই থামছে না দুর্ঘটনা। সবচেয়ে বিপজ্জনক সোনামসজিদ মহাসড়ক। দুর্ঘটনায় জেলায় যত মানুষ নিহত হন, তার চার ভাগের তিন ভাগই এ সড়কে। গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু- দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কে বিপুলসংখ্যক অযোগ্য ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হার কমছে না। মহাসড়কে নিষিদ্ধ হলেও নিয়মিতই চলছে সিএনজি ও অটোরিকশার মতো থ্রি-হুইলার যানবাহন।
বিআরটিএ ও জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৪, ২০২৫ ও ২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৪ মাসে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫০ জন। দুর্ঘটনায় অনেক পরিবার হারিয়েছে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। অনেক মা-বাবা সন্তানকে, সন্তানরা মা-বাবাকে হারিয়েছেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেকে অঙ্গ হারাচ্ছেন। মহাসড়কে তিন চাকার বাহন চলাচল, বেপরোয়া গতি ও আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতেই চলে বেশির ভাগ যানবাহন। এ মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক। বেড়েছে যাত্রীবাহী যান চলাচলও। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি প্রচুরসংখ্যক অটোরিকশা ও স্থানীয়ভাবে তৈরি ভটভটি-নসিমনও চলাচল করে।
মহাসড়কের ধারে কয়েকটি এলাকায় শুধু ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা, আস্তে গাড়ি চালান’- এমন ধরনের কয়েকটি সাইনবোর্ড টাঙিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌডালা-কানসাট সড়কের পুসকুনি এলাকায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলেসহ ৩ জন নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয় আরও ৮ জন। নাচোলের সোনাইচণ্ডী হাটে গরু বিক্রি করে অবৈধ পরিবহন ভটভটিতে করে তারা বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে ভটভটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, এতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সরকারের যেসব দপ্তরের দায়িত্ব, তারাই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তৎপর নয়। প্রতি বছরই সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী ২৮শে অক্টোবর ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ পালন করবে সরকার। ২০১৭ সাল থেকে সরকারিভাবে ২২শে অক্টোবর ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ পালন করা হয়। কিন্তু হিন্দু ধর্মের বড় উৎসব দুর্গাপূজার ছুটির কারণে এ কর্মসূচি পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ ২০১৮ সালের ২৯শে জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুই বাসের পাল্লায় বাসচাপা পড়ে দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এই ঘটনার পর পরই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। নজিরবিহীন এক সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনের পর তৎকালীন সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ পাস করে এবং বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সেগুলোর অধিকাংশই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
আইনজীবী মো. আব্দুস সালাম বলেন, সড়ক নিরাপত্তায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও আইন রয়েছে। তবে সঠিক প্রয়োগের অভাবে সড়কগুলো দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রতি বছর মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে বা আহত হচ্ছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষ সচেতন না হলে, দুর্ঘটনা কমানোর কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; এটি পরিবহন মালিক-শ্রমিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কেলের বিআরটিএ সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালক, মালিক ও পথচারী সবার দায়িত্ব রয়েছে। সবাই সচেতন হলে ট্রাফিকের শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে। সবাই আইন মানলে সড়ক দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।
