হরিরামপুরে ১৩ সার ডিলারের সবাই বিএনপি নেতাকর্মী ও তাদের স্বজন

হরিরামপুরে ১৩ সার ডিলারের সবাই বিএনপি নেতাকর্মী ও তাদের স্বজন

ফন্ট সাইজ:

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়নে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নতুন ডিলারশিপ পাওয়া ১৩ জনই বিএনপি নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি’র একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, ডিলারশিপ পাওয়া সবাই মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান (শান্ত)’র অনুসারী। অর্থ লেনদেন ও স্বজনপ্রীতি করে নিয়মের বাইরে গিয়ে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে, প্রশাসন বলছে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, নির্ধারিত শর্ত ও যোগ্যতা বিবেচনায় তারা ডিলারশিপ পেয়েছেন। গত শুক্রবার (৯ই অক্টোবর) কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে জেলার নতুন সার ডিলার নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদিত তালিকায় হরিরামপুরের ১৩ জন ডিলারের নাম রয়েছে। এর আগে গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে ১৬ই আগস্ট পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ডিলারশিপ পেতে প্রথম দফায় ৯২ জন এবং দ্বিতীয় দফায় ৩০ জন আবেদন করেন বলে জানা যায়। এদের মধ্যে থেকেই ১৩ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া সবাই জেলা কমিটির সুপারিশে ১ম স্থানে ছিল। ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা পর্যালোচনা ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. জুলমাত আলীর প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাফি এন্টারপ্রাইজ। তার ছেলে খোরশেদ আলম ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। গালা ইউনিয়নে নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাইমুন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান চৌধুরী ট্রেডার্স। চালা ইউনিয়নে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নীরব আহম্মেদ চুন্নুর স্ত্রী তছলিমা বেগমের মেসার্স তমাল এন্টারপ্রাইজ।

বলড়া ইউনিয়নে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. রেজাউল মৃধার প্রতিষ্ঠান রাবেয়া এন্টারপ্রাইজ। হারুকান্দি ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি মো. সেলিম মিয়ার স্ত্রী রাজিয়া আক্তারের মেসার্স লাবন্য ট্রেডার্স। বয়ড়া ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্য সচিব আবু সা’দাত মো. শাহীনের স্ত্রী হ্যাপী আক্তারের প্রতিষ্ঠান খোয়াব। এ ছাড়া রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সহ-যুব বিষয়ক সম্পাদক মো. লুৎফর রহমানের রিহাত এন্টারপ্রাইজ। গোপীনাথপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুল মতিন মোল্লার (লাভলু) ছেলে রবিউল ইসলামের মেসার্স মোল্লা ট্রেডার্স। কাঞ্চনপুর ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদের আজমেরী এন্টারপ্রাইজ। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. আজাহার উদ্দিনের ভাই আকমালের সালমান ট্রেডার্স। সুতালড়ী ইউনিয়নে বিএনপি’র কর্মী সুমন মিয়ার এস,এম ট্রেডার্স। ধুলশুড়া ইউনিয়নে উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মো. মিজানুর রহমানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স নিশাদ এন্টারপ্রাইজ। আজিমনগর ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি সামসুদ্দিন সরদারের মেসার্স সরদার ট্রেডার্স ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন। ধুলশুড়া ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা ব্যবসা করি, ব্যবসায়ী হিসেবেই ডিলারশিপ পেয়েছি। আমাদের প্রথম হলো ব্যবসা, পরে হলো রাজনীতি।

কাগজপত্র যা চেয়েছে ঠিকমতো জমা দিয়েছি, সে মোতাবেক পেয়েছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক সাবেক এক ছাত্রদল নেতা বলেন, হারুকান্দি ইউনিয়নে যে ডিলার পেয়েছে বাজারে তার কোনো ঘর (গুদাম) নাই। তার নামে সারের ডিলার কীভাবে হয়। তাহলে কি টাকা খেয়ে এদেরকে ডিলার দেয়া হয়েছে। উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রদল নেতা মো. নাসির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সারের ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, অর্থ লেনদেন ও অনিয়ম হয়েছে। নিয়োগের অনিয়মের বিষয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীর বরাবর আবেদন করবো। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রোববার দুপুরে অফিসে গেলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ফারজানা আক্তারকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব শাহজাহান সিরাজ বলেন, সার নীতিমালা-২০২৬ এর নিয়ম-কানুন মেনে ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে। কে কোন রাজনৈতিক দলের, সেই বিষয় নিয়ে আমাদের মন্তব্যের প্রয়োজন নেই। উপজেলা থেকে যে বিষয় আছে, জেলা থেকে গেছে, মন্ত্রণালয় সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ব্যক্তি যারা পাওয়ার তাদেরই দিয়েছে। কে কোন দল-মত-পথ করে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি না।