বিরোধিতা করে স্বৈরাচারের পথ উন্মুক্ত করলে পরিণাম ভালো হবে না: প্রধানমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

বিরোধী দলের বিরোধিতার রাজনীতির কারণে স্বৈরাচারের আসার পথ উন্মুক্ত হলে তার পরিণাম ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেছেন- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ এবং আধুনিকভাবে নির্মিত ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি এ মন্তব্য করেন। সকালে সচিবালয়ের পাশে আধুনিকভাবে নির্মিত ওসমানী উদ্যানের দ্বার উন্মোচন এবং উদ্যানে জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের উদ্বোধন করেন- প্রধানমন্ত্রী। তিনি উদ্যানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ দেখছে যে, বিরোধী দল বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে যাচ্ছে। ঠিক আছে বিরোধিতা আপনারা করেন। আজকে বিরোধিতা করতে গিয়ে আপনারা যদি স্বৈরাচারকে আসার পথ উন্মুক্ত করে দেন তাহলে অবশ্যই সেটি দেশের জন্য কোনো ভালো পরিণাম বয়ে আনবে না। সেটি যেমন জুলাইয়ের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি করা হবে, একইভাবে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও একইভাবে গাদ্দারি করা হবে।

এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন ঠিক একইভাবে অন্য যে রাজনৈতিক দলগুলো যাদের সঙ্গে বিএনপি নির্বাচন করেছে, সেই দলগুলোকে বাংলাদেশের জনগণ বিরোধী দলের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। অর্থাৎ সংসদের সরকারি দল বা বিরোধী দলের অর্থ হচ্ছে যে, সেখানে জনগণ ও দেশের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা হবে, আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত হবে। সিদ্ধান্তের পরে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারপ্রধান বলেন, বিরোধী দল বিরোধিতা করার জন্যই শুধু বিরোধিতা করছে, আপাতত উদ্দেশ্যে আমাদের কাছে এটি মনে হচ্ছে। এখন বিরোধিতা করার জন্যই যদি বিরোধিতা হয়, আমরা যদি সেই পুরনো কালচারে থেকে যাই তাহলে দেশকে সামনে কী করে এগিয়ে নিয়ে যাবো? বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে আহ্বান রেখে তিনি বলেন, বিরোধী দল অবশ্যই বিরোধিতা করবে। কিন্তু সেটি অবশ্যই গঠনমূলক বিরোধিতা হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছি জুলাইতে যারা শহীদ হয়েছেন সেই শহীদদের ঘিরে। হ্যাঁ সরকার একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে শহীদদের নিয়ে। আজকে এই অনুষ্ঠানটি জুলাই আত্মদানকারী মানুষদের নিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যারা তাদের যেমন দাওয়াত দেয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদলের নেতাসহ দলের যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদেরকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমি যদি আজকে প্রশ্ন করি আপনারা দাওয়াতে এলেন না। কিন্তু সত্যিকারভাবে যদি আপনারা জুলাইকে ধারণ করেন। আপনারা তো এসে জুলাই শহীদ মানুষগুলোর সঙ্গে বসতে পারতেন। কোথায়? আমরা তো আজকে আপনাদের দেখছি না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মঞ্চে বসার দরকার নেই, ঠিক আছে। সরকারের সঙ্গে আপনাদের দূরত্ব আছে। যদি দূরত্ব আপনারা রাখতে চান, তাতে কোনো সমস্যা নাই। আজকে যেই মানুষগুলোর জন্য আপনারা বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যেই মানুষগুলোর জীবন উৎসর্গের কারণে, যে মানুষগুলো আহত হওয়ার কারণে, যে মানুষগুলো চোখ হারানোর কারণে আজ আপনারা বিরোধী দলের নেতা হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত লাভ করেছেন, সেই মানুষগুলোর মাঝে তো আমরা আপনাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার চেষ্টা করছে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। জনগণের ভোট নিয়ে যেমন আপনারা বিরোধী দলে বসেছেন জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছি। বিরোধী দল মানেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব আর সরকারি দল মানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নয়, সরকারি দল মানেই মনে করা হবে যে তারা মানুষের স্বার্থ দেখছে না, এইভাবে বোধহয় দোষারোপ করা বা এই যে ব্লেমিংয়ের রাজনীতি- এ থেকে বোধহয় আমাদের এখন বের হয়ে আসা উচিত।

তিনি আরও বলেন, আপনাদের বক্তব্য থাকতেই পারে, সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধন সংস্কার এসব বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য থাকতেই পারে। এইসব বিষয় ফায়সালা করার জন্যই জনগণ আপনাদেরকে এবং আমাদেরকে সংসদে পাঠিয়েছে। জনগণ এজন্যই আমাদেরকে সংসদে পাঠিয়েছে যে, সংসদে বসে আমরা আলাপ-আলোচনা করবো, যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করবো এবং সেখানে বসে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো। যাতে বাইরে জনগণ প্রতিদিনের আমাদের যে জীবনযুদ্ধ সে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এই সকল বিষয়ে যাতে আমরা সড়ক অবরোধ করে বা বিভিন্নরকম বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রা ব্যাহত না করি, এটি হচ্ছে জনগণের চাওয়া। জনগণ বর্তমানে চায় স্থিতিশীলতা, জনগণ চায় শান্তি, জনগণ চায় দেশ এগিয়ে যাক। জনগণ চায় তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটুক।

তিনি বলেন. আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন পত্রপত্রিকা খুললেই আমরা এখন দেখছি, ডেঙ্গুর বিষয়টি। ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং একই সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনারা খেয়াল করেছেন গত প্রায় দেড় মাস ধরে সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এতে বিভিন্ন মানুষ, সেটি বিএনসিসি হোক, সেটি স্কাউট হোক, সেটি আমাদের স্কুল- কলেজের সন্তানরা হোক, সেটি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হোক, সেটি আমাদের সমগ্র বাংলাদেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হোক- আমরা বহু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালু রেখেছি। যাতে করে ডেঙ্গুকে প্রতিরোধ করতে পারি অথবা ডেঙ্গুর প্রকোপ আমরা কমিয়ে আনতে পারি। যাতে করে যদি কেউ অসুস্থ হয়, সেই অসুস্থ মানুষের সংখ্যাও যাতে কম হয় সেটির চেষ্টাই আমরা করছি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলম বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি বক্তব্য রাখেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ হাবিবসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যগণ, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

নগর ভবন পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর: এদিকে দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবন পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উপ-প্রেসসচিব হাসান শিপলু এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ঢাকাকে সুন্দর রাখতে, পরিচ্ছন্ন রাখতে, বাসযোগ্য করতে তিনি তার বার্তাটি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় সভায় বলেছেন, সবার কথা বাদ দেন, নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলি। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টা করি।
পরে প্রধানমন্ত্রী নগর ভবনের জরুরি পরিচালন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে আবহাওয়ার তথ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ভূমিকম্প-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য, বাতাসের গতিবেগ, বন্যার পূর্বাভাস এবং বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখেন। এসব তথ্য কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে কীভাবে জানা যায়, সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর উন্নয়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও চিত্রও দেখেন তিনি। মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব শহীদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।