বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং একমাত্র দূরশিক্ষণভিত্তিক বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। জনবহুল, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যপূর্ণ ও আর্থসামাজিকভাবে অসম বাংলাদেশে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা। ১৯৭৮ সালে স্কুল ব্রডকাস্টিং পাইলট প্রকল্প, ১৯৮৩ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিস্ট্যান্স এডুকেশন প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে দূরশিক্ষার যে ভিত্তি গড়ে ওঠে, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ২১শে অক্টোবর বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাউবি’র মূল দর্শন ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। বয়স, পেশা, আর্থসামাজিক অবস্থা কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কেউ যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য। আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তির ব্যবহার, নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মমুখী জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বাউবি কাজ করে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার ৩৪ বছরের পথচলায় বাউবি দেশের শিক্ষা সমপ্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্কুল অব এডুকেশনের বিএড প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সাতটি স্কুলের অধীনে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো হলো স্কুল অব এডুকেশন, স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস, হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ, ওপেন স্কুল, স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, স্কুল অব বিজনেস, স্কুল অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট এবং স্কুল অব ল’।
বর্তমানে বাউবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। ৫৫টি একাডেমিক প্রোগ্রামে ওপেন অ্যান্ড ডিস্ট্যান্স লার্নিং (ওডিএল) ও ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে তিন লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। নিয়মিত শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষকে শিক্ষা ও কর্মজীবনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির সুযোগ করে দেয়া বাউবি’র অন্যতম সাফল্য।
শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণেও বাউবি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গাজীপুরে মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সারা দেশে রয়েছে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং প্রায় দেড় হাজার স্টাডি সেন্টার। এ বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
কর্মমুখী ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বাউবি’র একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সমপ্রসারণ এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে ‘নিশ-৩’ প্রোগ্রামের আওতায় এসএসসি ও এইচএসসি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চাহিদা বিবেচনায় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়নের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এ কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষার সুযোগ সমপ্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের অগ্রগতিতে অবদান রাখা। এ লক্ষ্যেও বাউবি কাজ করছে। কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় গবেষণাগারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা সমপ্রসারণ করা হচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রচারের জন্য কেন্দ্রীয় জার্নাল ও সাতটি স্কুলের নিজস্ব জার্নাল প্রকাশের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণার পরিধি সমপ্রসারণেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামীর বাউবি’র অন্যতম অগ্রাধিকার ডিজিটাল রূপান্তর।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ডিজিটাল পেডাগজিতে প্রশিক্ষণ, মোবাইল অ্যাপ ও ই-লার্নিং প্ল্যাটফরমের ব্যবহার সমপ্রসারণ এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করা জরুরি। পাশাপাশি নারী, প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক ও কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের জন্য নমনীয় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ই-নথি ও অটোমেশন ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অতীতের অর্জন মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের নতুন প্রত্যয় গ্রহণের উপলক্ষ। প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন-সবার জন্য শিক্ষা, সুযোগের সমতা ও জীবনব্যাপী জ্ঞানচর্চাকে ধারণ করে বাউবিকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করাই আমাদের লক্ষ্য। গুণগত শিক্ষা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ, স্বচ্ছ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সেবার সমন্বয়ে বাউবি জাতীয় উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
