ইউরোপিয়ান ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এবং রোমাঞ্চকর কামব্যাকগুলোর একটি হলো ২০১৭ সালের সেই রাত। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) মাঠে সেবার ৪-০ গোলে হারের পর ফিরতি লেগে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফরাসি জায়ান্টদের স্তব্ধ করে দেয় বার্সেলোনা। ক্যাম্প ন্যুর সেই রুদ্ধশ্বাস রাতটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না, বরং তা ছিল অদম্য মানবিক ইচ্ছাশক্তি আর রূপকথার বাস্তব রূপায়ণ। আজ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের ম্যাচে আরেকবার মুখোমুখি হচ্ছে বার্সেলোনা ও পিএসজি। ম্যাচ শুরু রাত ১টায়। ক্যাম্প ন্যুর সেই ম্যাচের ভূত হয়তো আজও তাড়িয়ে বেড়ায় পিএসজিকে। থিয়েটারে পরিণত হওয়া স্টেডিয়ামে ৩ মিনিটেই লুইস সুয়ারেজের গোলে ব্যবধান কমায় কাতালানরা। এরপর প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার ব্যাকহিলে আত্মঘাতী গোল উপহার দেয় সফরকারীরা। বিরতির ঠিক আগে স্কোরলাইন ২-০ হওয়ায় বাতাসে ভেসে বেড়াতে শুরু করে অলৌকিক কিছুর সম্ভাবনা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০।
পুরো ক্যাম্প ন্যু তখন উল্লাসে মাতোয়ারা। তবে নাটকীয়তার তখনো অনেক বাকি। ৬২ মিনিটে এডিনসন কাভানির দুর্দান্ত শটে ম্যাচ আবার ঘুরে যায়। অ্যাওয়ে গোলের সমীকরণ মেলাতে বার্সার তখন প্রয়োজন আরও তিন গোল। ৮৭ মিনিট পর্যন্ত দর্শকরা হতাশায় স্টেডিয়াম ছাড়তে শুরু করেন। তবে নাটকের শেষাংশ যে তখনো বাকি। ৮৮ মিনিটে নেইমার জুনিয়রের চোখ জুড়ানো ফ্রি-কিক এবং ৯১ মিনিটে সফল পেনাল্টি শটে স্কোর হয় ৫-১। এরপর যোগ করা সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে (৯৫ মিনিট) ব্রাজিলিয়ান মহাতারকার ভাসানো বলে অবিশ্বাস্যভাবে পা বাড়িয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন সার্জিও রবার্তো। ক্যাম্প ন্যুর সেই ঐতিহাসিক গর্জন ছোটখাটো ভূমিকম্পেরও জন্ম দেয়। ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের সেই অবিস্মরণীয় স্মৃতির পর কেটে গেছে বহু বছর। বর্তমান ফুটবল প্রেক্ষাপটে পিএসজি ও বার্সেলোনা আবারও এক নতুন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
প্যারিসিয়ানদের স্কোয়াডে এখন নতুন তারুণ্যের ছোঁয়া। সেন্নি মায়ুলু এবং আলেসান্দ্রো লঙ্গোনি সামান্য চোটের কারণে আগের স্ট্রাসবুর্গ ম্যাচ মিস করেছেন। তবে ফিট হয়ে মূল দলে ফিরেছেন তারা। উইলিয়ান পাচো, ভিতিনহা, নুনো মেনদেস, ফাবিয়ান রুইজ, আশরাফ হাকিমি, উসমান দেম্বেলে এবং দেজিরে দুয়ের মতো তারকারা আগের ম্যাচে বিশ্রাম পাওয়ায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে নামছেন। অধিনায়ক মার্কুইনহোসও স্কোয়াডে ফিরছেন। অন্যদিকে, বার্সেলোনার ডাগআউকে চোটের ধাক্কা কিছুটা চিন্তায় রেখেছে। আন্দ্রেস ক্রিস্টেনসেন ও রুনি বার্দগি এখনো মাঠের বাইরে। রিয়াল বেটিসের বিপক্ষে ম্যাচে জুল কুন্দে, এরিক গার্সিয়া এবং জেরার্ড মার্টিন চোট পেলেও কুন্দে ও মার্টিনের ফিটনেস নিয়ে আশাবাদী কোচ হান্সি ফ্লিক। তবে গ্যাব্রিয়েল জেসুসের ফেরা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। চোট কাটিয়ে ওঠা রাফিনহাকে নিয়েই মূল একাদশে ফিরিয়ে আক্রমণভাগ সাজাতে পারেন ফ্লিক। তবে সব ছাপিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় ২০১৭র সেই ঐতিহাসিক রাত।
এরপর আরও তিন মৌসুমে মুখোমুখি হলেও ৬-১ স্কোরলাইনের ম্যাচটিই যেন চোখে ভাসে ফুটবলপ্রেমিদের। পিএসজির জন্য ম্যাচটির অভিঘাত শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উরুগুইয়ান ফরোয়ার্ড এডিনসন কাভানি পরবর্তীতে স্বীকার করেন সেই ধাক্কা এতটাই গভীর ছিল যে, তা কাটিয়ে উঠতে তাকে সাইকোলজিক্যাল থেরাপির সাহায্য নিতে হয়। এমনকি এই বিপর্যয়ই পরবর্তীতে বার্সার তৎকালীন মহাতারকা নেইমারকে রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে পিএসজিতে পাড়ি জমাতে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে, যা বিশ্ব ফুটবলের দলবদলের বাজারকে বদলে দেয়।
