শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় স্বজনরা

ইনানী ট্র্যাজেডি

শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় স্বজনরা

ফন্ট সাইজ:

কয়েকদিন আগেও যাদের সঙ্গে ছিল কথা, যাদের নিয়ে ছিল ঘরে ফেরার অপেক্ষা, তারা এখন কোথায়? আগুনের লেলিহান শিখা নিভেছে, পুড়ে ছাই হয়েছে রিসোর্টের কক্ষ। উদ্ধার হয়েছে ১০টি মরদেহ। কিন্তু স্বজনদের বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন নেভেনি। কেউ খুঁজছেন স্ত্রীকে, কেউ সন্তানকে, কেউবা একটি পুরো পরিবারকে। হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা করছেন তারা। কারও চোখে অশ্রু, কারও কণ্ঠে কান্না আটকে আছে। তাদের অপেক্ষা এখন শুধু নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ পাওয়ার নয়, শেষবারের মতো মুখটি দেখে বিদায় জানানোরও। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এমনই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে স্বজনদের। শনিবার থেকে নিখোঁজদের খোঁজে কখনো রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে, কখনো হাসপাতালের মর্গে ছুটছেন তারা। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা না যাওয়ায় অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে স্বজন হারানোর আশঙ্কা। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ফারিহা কবির ও তার শিশুসন্তান ফায়িজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহজাবিন আলভী ও ইসরাত জাহান মালিহা। তিন বোনের ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে উদ্বিগ্ন আমিনুল ইসলাম। বাড়ি থেকে একের পর এক ফোন আসছে। ওপাশ থেকে স্বজনরা জানতে চাইছেন, কোনো খবর পাওয়া গেছে কি না। কিন্তু দেয়ার মতো কোনো উত্তর নেই। স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই কান্না ধরে রাখতে পারছেন না তিনি।

অন্যদিকে নিহতদের চাচা রিয়াজ মাহমুদ রিপন হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে স্বজনদের সেখানকার পরিস্থিতি দেখাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে নিশ্চিত করে কিছু জানতে না পারার অসহায়ত্ব, দুইয়ে মিলে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছে যন্ত্রণার। নাহিদুর রহমানের পরিবারের মতোই স্বজন হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে ইলিয়াস, রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও আমিনুল ইসলামের। তাদের ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজ মিলছে না। ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসা ডলার মাহমুদও খুঁজছেন চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তার স্বামী নাহিদুর রহমান এবং দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে গড়া চার সদস্যের পরিবারটিকে। স্বজনদের খোঁজে তাদের এই ছুটে চলা এখন হাসপাতালের মর্গ আর পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ ঘিরে। উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত যে, খালি চোখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিরা অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা জানতে তদন্ত চলছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল তাদের মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানান, নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন থাকলেও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ১০টি। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে নতুন করে তল্লাশি চলছে। ফলে মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানেও তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।

রিসোর্টে বেড়াতে এসে আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল তাদের। ফিরে যাওয়ার কথা ছিল নানা স্মৃতি নিয়ে। অথচ সেই ভ্রমণই এখন স্বজনদের জীবনে নেমে এনেছে গভীর অনিশ্চয়তা। খালিদের মনে ফিরে ফিরে আসছে নাহিদুরের শেষ ফোনকল। ফয়সাল অপেক্ষা করছেন স্ত্রীর মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য। ডলার মাহমুদ খুঁজছেন চার সদস্যের একটি পরিবারকে। আমিনুল ইসলাম ও রিয়াজ মাহমুদ রিপনের অপেক্ষা ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করতে হবে। তত দিন স্বজনদের উৎকণ্ঠা কাটার সহজ কোনো পথ নেই। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে তাই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা। এই অপেক্ষা শুধু একটি নাম নিশ্চিত হওয়ার নয়, প্রিয়জনের পরিণতি জানার। আর যদি সব আশা নিভে যায়, তবে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর।