টেকসই পোশাকশিল্প গড়তে বিজিএমইএর ইএসজি প্ল্যাটফর্ম চালু

টেকসই পোশাকশিল্প গড়তে বিজিএমইএর ইএসজি প্ল্যাটফর্ম চালু

ফন্ট সাইজ:

বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড পূরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ চালু করেছে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ পর্যন্ত ৩২৬টি কারখানা এই প্ল্যাটফর্মে তথ্য দিয়েছে। শিল্পের স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শিগগিরই সদস্য কারখানাগুলোর জন্য প্ল্যাটফর্মে তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে সংগঠনটির।
সোমবার রাজধানীর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নূরুল কাদের অডিটোরিয়ামে ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ বা ইএসজি ড্যাশবোর্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভাপতিত্ব করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
ইএসজি বলতে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ডকে বোঝায়। বৈশ্বিক ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গুরুত্ব বাড়তে থাকায় পোশাকশিল্পে এসব মানদণ্ড পূরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত চাহিদা ও টেকসই পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে আরও বেশি কমপ্লায়েন্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে। বিজিএমইএর উদ্যোগে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্ম সদস্য কারখানাগুলোর পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৩২৬টি কারখানা প্ল্যাটফর্মে তথ্য দিয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। শিল্পের সার্বিক স্বার্থে শিগগিরই সদস্য কারখানাগুলোর জন্য তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। প্রয়োজনে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, গত আট মাসে সরকার জ্বালানি খাতে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে। আগের সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।
উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সক্ষম ও সুস্থ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তিনি আরও বলেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সংস্কার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরাও এ অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিজিএমইএর পরিচালক ও ইএসজি প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্যোক্তা শেখ হোসাইন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ বলেন, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য তৈরি পোশাকশিল্পকে শুধু কমপ্লায়েন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপান্তর করা।
৩২৬টি কারখানার তথ্য নিয়ে তৈরি প্ল্যাটফর্মটি শিল্পের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং টেকসই উন্নয়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকায় নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য, পুনর্গঠন ও উত্তরণপ্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে জুলাই চার্টার বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি পোশাকশিল্প। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রচলিত কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে সাসটেইনেবিলিটির দিকে এগোনো এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শক্তিশালী রপ্তানিভিত্তি অপরিহার্য। ইএসজি-সংক্রান্ত তথ্যকে কার্যকর সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগে রূপান্তর করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের সাফল্য অর্জন সহজ হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক মুন্সি সোলায়মান বিজিএমইএর সব সদস্য কারখানাকে এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, পরিচালক নাফিস উদ দৌলা এবং সংগঠনটির অন্যান্য নেতারা।
বিজিএমইএর উদ্যোগে চালু হওয়া প্ল্যাটফর্মটি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাস। কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি)।