ফ্রান্সে স্কুলগুলোর সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনপরিষেবা খাতের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চরম সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ব্যাপক ভাঙচুর, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় সামপ্রতিক
দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গায় পরিণত হয়েছে। চলমান এই বিক্ষোভে শনিবার সারা দেশে অন্তত ১২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই প্রতিবাদ, বিক্ষোভের ঢেউ এখন ইউরোপের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভে উস্কানি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিক্ষোভকারীরা দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। লিমোজেস শহরের ১৪৩ বছরের পুরনো সিটি হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন একে ‘ঐতিহ্যের জন্য এক বড় বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছে। লিঁও শহরে আগুন দেয়া হয়েছে একটি সুপরিচিত ঐতিহাসিক পর্যটন অফিসে। সেখানে আগুন নেভাতে যাওয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বাধা দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। মার্সেইতে বিক্ষোভকারীরা ধাক্কা দিয়ে সিটি হলের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং দেয়ালে নৈরাজ্যের প্রতীক এঁকে দেয়। এ ছাড়া বিবিসি’র যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রেনোবল শহরের একটি সরু রাস্তায় মুখোশধারী ব্যক্তিরা একটি কারাভ্যান চালিয়ে তিনজন দাঙ্গা পুলিশের দিকে তেড়ে যাচ্ছে।
রাজধানী প্যারিসের পরিস্থিতিও উত্তাল। প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় গাড়ি, ডাস্টবিন, একটি পত্রিকা বিক্রির কিয়স্ক এবং ‘লা বারিক’ নামের একটি রেস্তরাঁয় আগুন ধরিয়ে দেয়। সুযোগসন্ধানীরা গ্যালারিজ লাফায়েট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ল্যাকোস্ট ও এসএফআর মোবাইলের শোরুম এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল দোকানে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে।
মূলত গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় দরিদ্র শহরতলিগুলোতে শিক্ষক সংকট ও স্কুলের বেহাল দশার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের হাত ধরে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। মঙ্গলবার প্যারিসের সেন্ট-ডেনিস শহরতলির একটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই বিক্ষোভে যোগ দেন প্রখ্যাত জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থানবার্গ। ধীরে ধীরে এটি একটি দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সিজিটি ইউনিয়নের সদস্য, সাধারণ শ্রমিক, কৃষক এবং অবসরপ্রাপ্তরা।
২০১৮ সালের বিখ্যাত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট পরিহিত আন্দোলনকারীরাও নতুন করে রাস্তায় নেমেছেন। বর্তমানে এই বিক্ষোভের মূল দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যের আকাশচুম্বী দাম কমানো এবং সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য দূর করা। অক্টোবরে দুই হাজার মানুষের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, ফ্রান্সের ৪৫ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। শনিবারের বিক্ষোভে অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নিলেও, আন্দোলনকারীদের দাবি এই সংখ্যা আট লাখের বেশি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করছে। শনিবারের সংঘর্ষে অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। ফ্রান্সের পুলিশ ইউনিয়ন ‘ইউএনএসএ’ এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি তাদের সহ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে এবং তাদের সহকর্মীদের ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে, পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে দুই তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় পুলিশের কৌশল নিয়েও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। এদিকে ফ্রান্সের এই বিক্ষোভের আঁচ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও লেগেছে। পর্তুগালের লিসবনে আবাসন সংকটের জেরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ইতালির মিলান ও বোলোগনায় টিয়ার গ্যাস ও জলকামান দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করেছে পুলিশ। বেলজিয়ামে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। এ ছাড়া আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হওয়া বিক্ষোভে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়েছে বলে জানা গেছে।
