চারদিকে উৎসবের আনন্দ। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে চলছে সব বয়সের, সব ধর্মের মানুষের মণ্ডপ ও প্রতিমা দর্শনের আনন্দ। কিন্তু সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার একটি পূজামণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু ও ২৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা মুহূর্তে সব আনন্দকে বিষাদের সুরে ভরিয়ে তুলেছে। চারদিকে শোকের আবহ। ১৯টি পরিবারে শোকের মাতন। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার, এমনকি প্রতিবেশী রাজ্য বিহার থেকে আসা একটি পরিবারও পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। মৃতদের তালিকায় রয়েছেন শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী থেকে প্রবীণেরা। সবচেয়ে কম বয়সী মৃতের বয়স মাত্র ৭ বছর। সবচেয়ে বেশি বয়স ৬৬ বছর।
উত্তর ২৪ পরগনার পাণিহাটির ১৩ বছরের কিশোর প্রাঞ্জল সরকার বাবা-মায়ের সঙ্গে পূজা দেখতে গিয়েছিল। সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সার্বজনীনের পূজামণ্ডপে প্রবেশ করেছিলেন প্রতিমা দেখতে। এক সময় ভিড়ের চাপে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেনি সে। যতক্ষণে তাকে উদ্ধার করা হয় ততক্ষণে সব শেষ। প্রাঞ্জলের মা ছেলের মৃত্যুর খবর এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না।
উত্তর কলকাতার কুমোরটুলির বাসিন্দা ২৫ বছরের সোনু পাল মা’কে হারিয়েছেন চোখের সামনে। তিনি জানিয়েছেন, মণ্ডপের আলো নিভে গেল মুহূর্তে। চারদিকে মানুষের চিৎকার। কেউ মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন, কেউ ভিড়ের চাপে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তিনিও ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন। কোনোরকমে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ান। তারপর মাকে খুঁজতে গিয়ে দেখেন, তার মা আর বেঁচে নেই। কান্নায় ভেঙে পড়ে সোনু বলেন, চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু দেখেছেন তিনি। তার আশঙ্কা, একটু এদিক-ওদিক হলেই হয়তো তিনিও প্রাণে বাঁচতেন না।
নদীয়ার চাকদহের বাসিন্দা রাম সরকার স্ত্রীর মৃত্যুতে বিলাপ করে চলেছেন-আমি ওকে তুলতে পারিনি, আমি একা হয়ে গেলাম। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিও দেখে চোরবাগানে যেতে চেয়েছিলেন আরতি সরকার। স্বামী ও বোনঝিকে নিয়ে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন। তবে ঠাকুর দেখে আর বাড়ি ফেরা হলো না তার। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার এই পূজামণ্ডপেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরতি। স্ত্রীকে হারিয়ে আফসোস করছেন স্বামী রাম সরকার। তিনি জানিয়েছেন, মণ্ডপের ভেতরে খুব অন্ধকার ও প্রচুর ভিড় ছিল। ভিড়ের চাপে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মণ্ডপে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। পেছন থেকে প্রচুর মানুষের ভিড় ঠেলতে থাকে। চাপে মাটিতে পড়ে যান তিনি। আলাদা হয়ে যান পরিবারের বাকিদের থেকে।
সপ্তমীর দিন পূজা দেখতে বেরিয়েছিল নিউ টাউনের গৌরাঙ্গনগরের অভিন্ন হৃদয় দুই বন্ধু তানিয়া বিশ্বাস আর বর্ণালী হালদার। চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছে ১৭ বছরের দুই বন্ধুই। তবে মৃত্যুতেও কেউ কারও হাত ছাড়েন নি।
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গোৎসবের ইতিহাসে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে সর্বোচ্চ প্রতিমা দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে সেবার ১১ জন আহত হয়েছিলেন। কিন্তু এবার সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সার্বজনীনের পূজামণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন হাতিবাগানের এক প্রবীণ বাসিন্দা হেম চন্দ্র দে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেছেন, কলকাতায় পূজামণ্ডপে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা আমি কোনোদিন শুনিনি। তিনি খানিকটা ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, থিমের পূজার যে উন্মাদনা সামপ্রতিক সময়ে তৈরি হয়েছে তাতে গা-ভাসিয়ে মানুষ নিজেদের বিপদই ডেকে আনছেন।
চোরবাগানের পূজামণ্ডপে ঠিক কী ঘটেছিল তা ২৪ ঘণ্টা পড়েও স্পষ্ট নয়। সমাজমাধ্যমে রিলের দৌলতে তৈরি হওয়া আগ্রহে মাত্রাতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়েছিল। সেই সঙ্গে বৃষ্টি আসায় সবাই মণ্ডপের মধ্যে জোর করে ঢুকতে চেষ্টা করেছিলেন। শুরু হয়েছিল ধাক্কাধাক্কি। এমন সময় মাইকে ভেসে ওঠে এক কণ্ঠস্বর। আতঙ্ক এবং উদ্বেগ জড়ানো সেই কণ্ঠস্বরকে বলতে শোনা যায়, ‘‘এক্সিট গেট খুলে দাও। মণ্ডপের দিকে কেউ আসবেন না। মণ্ডপ পড়ে গিয়েছে। ভেঙে গিয়েছে, বেরিয়ে যান।’’ এরপরেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন দর্শনার্থীরা। শুরু হয়ে গিয়েছিল মণ্ডপ থেকে বেরোনোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা। এই রকম একটি ভিডিও সামনে এসেছে।
কল্যাণী থেকে পূজা দেখতে আসা এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ। তারা পরস্পরকে ঠেলাঠেলি করতে থাকেন। তাতেই কয়েকজন মণ্ডপের ভেতরে বৃত্তাকার পথে পড়ে যান। পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে ভিড় ও বৃষ্টিকে দায়ী করা হলেও অনেকেই এই মণ্ডপের থিম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বর্ধমান থেকে আসা মৃদুল দে জানিয়েছেন, মণ্ডপের ভেতরে আলো আঁধারির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে মণ্ডপে প্রবেশ করার পথে ছিল একটি বৃত্তের মতো ‘এলিভেটেড করিডোর’। সেখান দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে মণ্ডপ থেকে বেরোতে হচ্ছিল। সেই করিডোরেই বিপত্তি ঘটেছে। বেরোনোর পথেও ছিল অপর্যাপ্ত আলো।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মেছুয়াবাজারে সরু গলির মধ্যে এই পূজামণ্ডপ। পূজার উদ্বোধনের পরে বারে বারে ভিড়ের চাপে ব্যারিকেড ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। তবুও প্রশাসন বা পূজা কর্তৃপক্ষ সচেতন হন নি। পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যবস্থা ছিল না বলে তার অভিযোগ। তিনি বলেছেন, অভিজ্ঞতাহীন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে জনতার স্রোত সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, মণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকও ছিল না। প্রবেশ ও বেরোনোর পথও ছিল সরু। আলো কম থাকায় পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে বলে দাবি তাদের।
কীভাবে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ নিয়ে তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ঘটনার পেছনে কোনো গাফিলতি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
চোরবাগানের পূজামণ্ডপ সিল করে দেয়া হয়েছে। জনসমাগম ঠেকাতে জারি করা হয়েছে ১৬৩ ধারা। সতর্কতা হিসেবে পদদলিত হওয়ার ঘটনার পর কলকাতার তিনটি পূজামণ্ডপের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো টালা প্রত্যয়, আলিপুর সার্বজনীন ও চেতলা সম্মিলনী।
পুলিশ জানিয়েছে, রাতভর ১৪ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলো- চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির সম্পাদক রাজকুমার সেওদা ওরফে রাজা এবং কমিটির সহ-সভাপতি শান্তনু দুবে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ঠাকুর দেখার ভিআইপি পাস চেক করা এবং ভিড় সামলানোর দায়িত্বে থাকা কৌশিক সাহা নামে এক ব্যক্তিকে। ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন পিন্টু দে। তাকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন পূজামণ্ডপের বাঁশের কাঠামো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত বিপ্লব মুখোপাধ্যায়। এ ছাড়া ধৃতদের তালিকায় রয়েছেন সুমন চক্রবর্তী এবং রাজেশ পাল। উভয়েই বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মী।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, একজন বিচারপতির অধীনে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, এবার পূজার ভিড় সামলাতে ৭ আইপিএসকে ফিরিয়ে এনেছে নবান্ন। তালিকায় রয়েছেন মুরলীধর শর্মা, রূপেশ কুমারও। এ ছাড়াও তালিকায় রয়েছেন প্রিয়ব্রত রায়, দীপক সরকার, মিরাজ খালিদ, সৌম্য রায় ও তরুণ হালদার। চোরবাগানের মতো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে আর তৈরি না হয় সেই কারণে এই সিদ্ধান্ত।
চোরবাগানের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
