বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে ব্যক্তিগত বৃত্তান্তে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে কমিশনের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এ তথ্য জানান।
সচিব জানান, ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জমা দেয়া সিভিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ‘অনারারি স্পেশালিস্ট/এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজ করার মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দেন সায়মা ওয়াজেদ। বর্তমানে হাসপাতালটির নাম বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। ওই তথ্য ব্যবহার করে তিনি সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডব্লিউএইচও’র গুরুত্বপূর্ণ ওই আঞ্চলিক পরিচালক পদের জন্য আবেদন করার সময় সায়মা ওয়াজেদ হোসেন ওরফে পুতুল নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অসত্য তথ্য দাখিল করেন। তিনি সিভিতে দাবি করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) তিনি ‘অনারারি স্পেশালিস্ট/এক্সপার্ট’ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন এবং সেখানে শিক্ষকতা ও শিক্ষা ম্যানুয়েল রিভিউ সম্পর্কিত কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
দুদকের দীর্ঘ তদন্তে দেখা গেছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কোনো কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততা ছিল না এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তার এই পদের সত্যতা পায়নি, যা সম্পূর্ণ বানোয়াট প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২০শে মার্চ মিথ্যা তথ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় চাকরি ও সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ২০টি ব্যাংক থেকে ৩৩ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে পৃথক দু’টি মামলা করে দুদক।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জমা দেয়া সিভিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে (বর্তমান নাম বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ‘অনারারি স্পেশালিস্ট/এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজ করার মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দেন সায়মা ওয়াজেদ। ওই তথ্য ব্যবহার করে তিনি সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করেন।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, পুতুল ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি অন অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এ কার্যক্রম চালান। সিভিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, সিভিতে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথি খোলা ও তথ্য যাচাই বাছাইয়ের সুযোগ না দিয়েই চাপ প্রয়োগ করা হয়। পরে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন, জাতিসংঘের কার্যালয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ডব্লিউএইচও’র সদর দপ্তরে এসব তথ্য পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুতুল আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পান।
দুদকের এজাহারে বলা হয়, আসামি সায়মা ওয়াজেদ হোসেন ওরফে সায়মা বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা বা শিক্ষা ম্যানুয়েল তৈরি বা রিভিউ সম্পর্কিত কার্যক্রমে অংশ না নিয়েও নিজেকে এই কাজে সম্পর্কিত মর্মে মিথ্যা দাবি করে ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আবেদন করেন। পরবর্তী সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়ে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৮/৪৭১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এজাহারে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাধ্যমে ২০১৭ সালে অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন নিযুক্ত হন সায়মা ওয়াজেদ। ওই পদে কর্মরত অবস্থায় ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দাখিল করা সিভিতে নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পুতুল লেখেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা/শিক্ষা ম্যানুয়েল রিভিউ সম্পর্কিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, অটিজম এবং মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।
