ঘরে ডেঙ্গু আক্রান্ত মা, হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন বোন

সরজমিন মুগদা মেডিকেল

ঘরে ডেঙ্গু আক্রান্ত মা, হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন বোন

ফন্ট সাইজ:

শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা। প্রধানমন্ত্রী আসার খবরে হাসপাতাল পরিচ্ছন্নতায় ব্যস্ত ছিলেন কর্মচারীরা। আর রোগীদের খোঁজখবর নিতে ব্যস্ত ছিলেন প্রতিটি ওয়ার্ডের দায়িত্বরত ডাক্তার আর নার্সরা। এ সময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. কাউসার দাঁড়িয়ে ছিলেন ১২তলার ভবনের বারান্দায়। পরিবারের দুই সদস্যের অসুস্থতায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কাউসারের। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বোনের চিকিৎসা চলছে।

অন্যদিকে বাড়িতেও ডেঙ্গু আক্রান্ত মা অসুস্থ হয়ে কাতরাচ্ছেন বিছানায়। বেড না পেয়ে পাশেই হাসপাতালের মেঝেতে মেট্রেস বিছিয়েই চিকিৎসা নিচ্ছেন তার বোন। প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। দু’দিক সামলাতে গিয়ে দিশাহারা কাউসার। বাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ভাইকে রেখে এসেছেন অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার জন্য। আর নিজে ছুটে বেড়াচ্ছেন হাসপাতাল ও বাসার মধ্যে। পরিবারের দুই সদস্যের অসুস্থতা, চিকিৎসার খরচ আর দেখভালের দায়িত্ব- সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তার ভার যেন একাই বইতে হচ্ছে তাকে।

কাউসার বলেন, বোনের গত একসপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড জ্বর কিছুতেই জ্বর কমছিল না, সঙ্গে বমি ও প্রচণ্ড শরীর ব্যথা। পরে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। প্লাটিলেট ২৫ হাজারে নেমে যাওয়ায় দ্রুত গত পাঁচদিন আগে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। অন্যদিকে মাও ঘরে ডেঙ্গু আক্রান্ত। মায়ের দেখাশোনার জন্য ছোট ভাইকে বাসায় রেখেছি। একবার হাসপাতাল একবার বাসা এইভাবে দিন যাচ্ছে। খাবার ও বাইরে থেকে কিনে দিয়ে আসতে হয়।

শনিবার রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শয্যা না থাকায় অনেক রোগী মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়িতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কোথাও রোগীর পাশে স্বজনের উৎকণ্ঠা, কোথাও অসুস্থ মানুষের কাতরানি— পুরো ওয়ার্ড জুড়েই যেন এক ধরনের চাপা আতঙ্ক। ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুরো হাসপাতাল। একটি বেডের আশায় কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, কেউ আবার মেঝেতেই শুয়ে স্যালাইন নিচ্ছেন। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা মাত্র ৪৮টি। অথচ বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০৫ জন। যা নির্ধারিত শয্যার প্রায় চারগুণ। রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হাসপাতালের ১১ ও ১২ তলা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত বেডের পাশাপাশি মেঝেতেও চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে ভর্তি ২০৫ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১০৯ জন মহিলা, আর ৯৬ জন পুরুষ। হাসপতালে গিয়ে ওয়ার্ড পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও মশারি টানানো দেখা গেলেও রোগীর স্বজনদের অভিযোগ- হাসপাতাল জুড়ে এতদিন ছিল নোংরা পরিবেশ। দেয়া হতো না মশারি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আসার খবর শুনে সকাল থেকেই হাসপাতাল পরিষ্কার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় কর্মচারীরা। প্রত্যেক ওয়ার্ডের ডাক্তার, নার্সরা সকাল থেকেই কিছুক্ষণ পরপর এসে খোঁজ নিচ্ছিলেন রোগীদের। যা অন্যান্য দিন ঠিকমতো নেয়া হতো না।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ তলায় ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ক্যানোলা হাতে শুয়ে ছিলেন যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জালাল হোসেন। স্যালাইন ঠিকমতো পড়ছে কিনা নলটি বারবার নাড়িয়ে দেখছিলেন স্ত্রী সালেহা বেগম। চোখে-মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। সালেহা বেগম জানান, স্বামী ও পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে দু’দিন ধরে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করছেন তিনি। স্বামীর ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর থেকেই যেন একের পর এক দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে তাকে। জ্বর, শরীর-ব্যথা ও দুর্বলতা নিয়ে জালালকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর তার প্লাটিলেট ছিল ১ লাখ ১০ হাজার। কিন্তু পরবর্তীতে তা দ্রুত কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৫ হাজারে। পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। তিনি আরও বলেন, এখানে এতদিন ধরে এত পরিষ্কার পরিচ্ছন ছিল না। হাসপাতাল ছিল নোংরা প্রধানমন্ত্রী আসার খবর শুনে সকাল থেকে কর্মচারীরা হাসপাতাল পরিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আয়ারা এসে সব বেড পরিষ্কার করে লাইন করে সমান করে দেয়। পাশাপাশি নার্স ডাক্তাররা এসে কিছুক্ষণ পর পর খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবেশ যদি সবসময় থাকতো তাহলে ২ দিনেই রোগী ভালো হয়ে বাসায় ফিরে যাবে। প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে এমন পরিবেশ থাকা উচিত।

মেডিকেল অফিসার ডা. সারা বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভর্তি রোগীদের মধ্যে তরুণ, প্রাপ্তবয়স্করাই বেশি, শিশু ও বয়স্ক রোগী তুলনামূলক কম। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশারি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পরিবারে একজন আক্রান্ত হলেও অন্য সদস্যদেরও মশারি টানিয়ে ঘুমানো উচিত। অনেক রোগীই জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত মশারি ব্যবহার করতেন না।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সাব-ইনচার্জ নাসিমা বলেন, আমাদের ওয়ার্ডে ৪৮টি শয্যা রয়েছে, কিন্তু তার বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছে প্রায় ২০৫ জন। জুলাই পর্যন্ত রোগী কম ছিল, কিন্তু এরপর থেকে রোগীর সংখ্যা হুহু করে বেড়েছে। প্রতিদিন নতুন রোগী যেমন আসছেন, তেমনি চিকিৎসা শেষে অনেকে বাড়িও ফিরছেন। রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ওষুধ দেয়া ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে আমরা সবাই কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, বেশির ভাগ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় নেন। তবে সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার সময় আরও দীর্ঘ হয়।