আজ শুক্লা মহাসপ্তমী বিহিত অধিক পূজা। বহু বছর পর তিথি বৃদ্ধির কারণে এ বছরই দুইদিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহাসপ্তমী। আর এই বাড়তি একটি দিন পেয়ে শারদীয় দূর্গোসৎসবের মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
গতকাল রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালী মন্দির, বনানী মাঠ, খামারবাড়ী, কলাবাগান মাঠ, সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই প্রতিটি প্যান্ডেলেই দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। কেউ সন্তানদের নিয়ে এসেছেন, কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউ বা এসেছেন বৃদ্ধ বাবা-মা’কে প্রতিমা দেখাতে। প্রতিটি মণ্ডপেই দেখা গেছে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা প্রবেশ দ্বার। আর এসব দর্শনার্থীর নিরাপত্তার জন্য পূজাঙ্গনে বাড়তি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।
গতকাল কামাল আতাতুর্ক পার্কের মাঠে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন আয়োজিত মণ্ডপে স্বামী ও তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে দুর্গাপূজা দেখতে আসা কবিতা দে বলেন, সারাটা বছর আমরা অপেক্ষায় থাকি কবে এই দুর্গাপূজা আসবে। কবে আমরা সকলে মিলে আনন্দে মাতবো। সেই অপেক্ষার পালা শেষ করে মা আমাদের মাঝে এসেছে। কিন্তু মাত্র দু’দিন পরই মা আবার ফিরে যাবেন কৈলাশে। তাই মা’কে দেখতে ছুটে এসেছি। চারিদিকে আলোকসজ্জা, বাঁশ-কাঠ, কাপড়সসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সাজানো জমকালো সব পূজামণ্ডপ দেখে খুব ভালো লাগছে। এ এক অন্য রকম অনুভুতি। তিনি বলেন, আমাদের ঢাকার ভেতর যতগুলো পূজা হচ্ছে তার মধ্যে বনানী মাঠের এই পূজাটা সব থেকে আলাদা। প্রতিমা বলেন আর প্যাণ্ডেল বলেন, সব থেকে আড়ম্বর এখানেই হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এবার এই মণ্ডপের প্রধান আকর্ষণ গতিশীল শিল্পকলা বা ‘কাইনেটিক আর্ট’। সম্মুখভাগে স্থাপিত ২৪ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার কাঠামো অবিরাম ঘুরে চলেছে। সেই ঘূর্ণায়মান কাঠামোর ভেতরের জলপ্রপাতসদৃশ অবিরত জলপর্দা ভেদ করে দেখা যাচ্ছে দেবী দুর্গার সৌম্য প্রতিমা। পুরো মণ্ডপজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পরিবেশবান্ধব লোকজ কারুশিল্প। বাঁশ, বেত, চট ও প্রাকৃতিক তন্তুর মতো ৩৬ ধরনের স্বতন্ত্র উপাদান দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পুরো অবয়ব। চারটি ভিন্ন প্রজাতির বাঁশ ও পাঁচ প্রকার বুননশৈলীর নিপুণ ব্যবহারে তৈরি হয়েছে ঢেউখেলানো বক্ররেখীয় কাঠামো, যা দেখলে মনে হয়, থমকে থাকা এক বিশাল জলতরঙ্গ। উপকূলীয় চট্টগ্রাম থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত অঞ্চলে ব্যবহৃত ১৩ ধরনের বিলুপ্তপ্রায় বাঁশের চাই বা দুয়াইর ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে মণ্ডপের ছাদের চাঁদোয়ায়। দর্শকের চলার পথটিকে সাজানো হয়েছে এক অনুভবের যাত্রা হিসেবে। প্রবেশদ্বারে রয়েছে বিমূর্ত পদ্মরূপী স্থাপত্য, যা পেরিয়ে ভেতরের দিকে এগোলে দেখা মিলছে শামুক ও শঙ্খের আদলে তৈরি শৈল্পিক অবয়ব। মাথার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে এক কল্পিত জলাধার। গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন মণ্ডপ ও প্রকৌশল বিষয়ক উপ-পরিষদের আহ্বায়ক স্থপতি অমিতি কুণ্ডু বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গুলশান-বনানী পূজা ফাউন্ডেশন ব্যতিক্রমী আয়োজন করে আসছে। এবারের ‘জলজ’ও বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলনির্ভর জীবন, স্থানীয় কারুশিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রকাশ।
এদিকে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখেপড়ার মতো। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন বাহিনী প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আগমনকে ঘিরে মন্দিরটিতে আলাদা নজর থাকে মানুষের। ডগস্কোয়াড, ফায়ারসার্ভিস, কন্ট্রোল রুমসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতিও দেখা গেছে মন্দিরটিতে। গতকাল দুপুরে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে দুর্গাপূজা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। রাষ্ট্রপতির আগমনে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সাধারণ দর্শনার্থীরা। কলাবাগান মাঠে ধানমণ্ডি সার্বজনীন পূজা কমিটির মণ্ডপও বিভিন্ন আলোকসজ্জা ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মেইন রাস্তার পাশে হওয়ায় সেখানেও ভিড় করছে দর্শনার্থীরা। রুম্পা বিশ্বাস নামে এক দর্শনার্থী বলেন, একে- অপরের আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যদিয়ে পূজার দিনগুলো কখন কেটে যায় টেরই পাই না। সব থেকে বেশি মজা হয় অষ্টমীর দিন সকালে অঞ্জলি দেয়া ও দশমীতে সিঁদুর খেলায়। পূজাকে ঘিরে নিজের ও আপনজনদের জন্য নতুন পোশাক কেনা-কাটাও কম আনন্দের না। খামারবাড়ী কৃষি ইনস্টিটিউটের দুর্গাপূজা মণ্ডপেরও একই চিত্র। এছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশন, বনানী, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, শাঁখারী বাজার, ওয়ারী, পশ্চিম ধানমণ্ডির দুর্গামন্দির, আখড়া মন্দির, নিমতলা মন্দির, ফার্মগেট, বনশ্রীসহ রাজধানীর অন্য এলাকাতেও জমকালোভাবে আয়োজন করা হয়েছে দুর্গাপূজার। অলিগলি, রাজপথ সাজানো হয়েছে আলোকসজ্জায়। মন্দিরে মন্দিরে শোভা পাচ্ছে মায়ের প্রতিমা। আগামীকাল সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৫ টা ৪৩ মিনিটের মধ্যে মহাঅষ্টমী তিথিতে সনাতনী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সকলে মিলে দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি দিবে। এইদিনই হবে সন্ধীপূজা। কুমারী পূজা। ২০শে অক্টোবর নবমীতে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর মহা প্রসাদ বিতরণ করা হবে। সর্বশেষ ২১শে অক্টোবর দশমী তিথিতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হবে দেবী দুর্গাকে। এবার নৌকায় চড়ে কৈলাশে ফিরবেন মা দুর্গা।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, এ বছর বাংলাদেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে রয়েছে ২৫৮টি মণ্ডপ। পূজা নির্বিঘ্নে পালন করতে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খালা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যপক নজরদারি করা হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছে। আশা করি আড়ম্বরের সঙ্গেই এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা পালিত হবে।
