আসন্ন বাজেটে ৩ বড় চ্যালেঞ্জ দেখছে সিপিডি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে সরকার

ফন্ট সাইজ:

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মনে করে, বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয়গুলো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব বিষয়ে জোর দিতে হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব কমবে বলে জানিয়েছে সিপিডি।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি’র কার্যালয়ে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সুপারিশসমূহ’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এতে বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে। এমন এক সময় এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি শক্ত করা জরুরি। তবে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক-দুই ধরনের প্রবণতাই রয়েছে। তবে, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির শঙ্কা: চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ, পুরো অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ দশমিক পাঁচ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাকি সময়ের মধ্যে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির কারণে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি: চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক তিন শতাংশ, যা গত প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিডি’র মতে, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প পর্যালোচনার কারণে এ ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। তবে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রকল্প বাছাই ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বেশি: দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো তা স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। সামপ্রতিক সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বাজার তদারকি জোরদার করাও জরুরি।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ: দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপি’র প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও (এফডিআই) খুব বেশি বাড়েনি। সিপিডি’র মতে, বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করায় কর্মসংস্থানের চাপও বাড়ছে।
জ্বালানিতে কর কমানোর সুপারিশ: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন এবং ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও কর কমালে এখাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ কারণে এসব পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম স্থানীয় বাজারে কতোটুকু প্রতিফলিত হবে, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতি উপাদান (পলিসি ইনস্ট্রুমেন্ট) রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফার বাইরেও জ্বালানির ওপর দেশে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার এই কর কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।
এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডি’র সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন বিপিসি থেকে বলা হয় ২৬-২৭ দিনের রিজার্ভ আছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় এপ্রিল মাস চলার মতো রিজার্ভ আছে। তারপরেও আর্টিফিসিয়াল ক্রাইসিস (কৃত্রিম সংকট) দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব কমবে: ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) সই করে বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় আমেরিকা থেকে সাড়ে ৪ হাজার পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ প্রকারের পণ্যে শুল্কমুক্তি সুবিধা দেবে। এ কারণে চলতি অর্থবছরেই সরকার আমদানি শুল্কবাবদ প্রায় এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেয়া হয়েছে। এটি ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতায় সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি বলেন, আর একটি বিষয় হচ্ছে ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ের শর্ত। এ কারণে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ এই চুক্তি রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের যে বিষয়টি রয়েছে, সরকারকে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করার দরকার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা: রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র: বৈদেশিক খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয় কিছুটা কমেছে। তবে, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।
এলডিসি উত্তরণ সামনে: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছু সুবিধা কমে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শুল্ক কাঠামো সংস্কারের মতো পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাস্তবসম্মত বাজেটের পরামর্শ: সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বাজেটে রাজস্ব ব্যয় এবং প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, সঠিক নীতি গ্রহণ করা গেলে আসন্ন বাজেট দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা। তিনি উল্লেখ করেন, স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা জরুরি। তবে একই সঙ্গে বাজেটে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যা নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করে এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন