দিনাজপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাফিউল ইসলাম। তিনি প্রাথমিকের শিক্ষক হলেও দুই ছেলেমেয়েকে দিয়েছেন কিন্ডারগার্টেনে। কারণ জানতে চাইলে বলেন, আমার স্কুলে ৬টি পদ, শিক্ষক আমরা ৩ জন। নেই প্রধান শিক্ষক। কোনোরকমে আমরা স্কুল চালাচ্ছি। আমরা চাইলেও এই স্কুলের মান ভালো করতে পারবো না। শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, পাঠদানের পরিবেশ ও শিক্ষার মান উন্নয়নে নজর দিতে হবে। একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থী সামলাতে হলে প্রত্যেক শিশুকে আলাদাভাবে সময় দেয়া সম্ভব হয় না। নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তো আমাকে ভাবতে হবে, তাই আমার স্কুলে দেইনি।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখতে উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্য বই বিতরণসহ নানা কর্মসূচি চালু রয়েছে। শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে বিপুল অর্থ। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। এতে শিক্ষার মান ও অভিভাবকদের আস্থার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৭৩ লাখের বেশি। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জনে। ৬ বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৬৭ লাখ। তবে এ সময়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেনি। ২০১৯ সালে সংখ্যা কমে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখে নেমেছিল। ২০২২ সালে তা আবার বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৪ সালে বড় ধরনের পতন দেখা যায়।
অন্যদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা বেড়েছে। ২০১৮ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন ৩ লাখ ৪৯ হাজার ২১৭ জন। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৯ জনে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে শিক্ষকসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন। অর্থাৎ শিক্ষার্থী কমার বিপরীতে ছয় বছরে শিক্ষক বেড়েছে ৩৪ হাজারের বেশি।
রংপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক তার সন্তানকে পড়াননি নিজ স্কুলে। তার কর্মস্থল বাড়ি থেকে হাঁটা পথে। আর কিন্ডারগার্টেন স্কুলটির দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার, বাজার এলাকায়। তিনি বলেন, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করাটা খুবই জরুরি। যেটা নানা কারণে সরকারিতে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। একটা বড় কারণ সামাজিক বৈষম্য। এ ছাড়াও কিন্ডারগার্টেনে সরকারি পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি পড়ানোর বিষয়ে একটা বেজড তৈরি হয়। যদিও এই বাড়তি পড়ালেখাটা কতোটা কাজে লাগে তা আলোচনাসাপেক্ষ।
তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কতোজন কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা কিংবা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে, আর কতোজন পড়াশোনার বাইরে চলে যাচ্ছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। সরকারি বিদ্যালয়ের বাইরে বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তারও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালে দেশে কিন্ডারগার্টেন ছিল ১২ হাজার ৪৮৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ২৪ হাজার ৩৬৩টিতে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ২৯৯টি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৮১ হাজারের বেশি। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর প্রি-প্রাইমারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ছিল। তবে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির আরও একটা বড় কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধিও।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি-৪ প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির পর মেয়াদও বাড়ানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে ব্যয়ের পরিমাণ ৫১ হাজার কোটি টাকার বেশি ধরা হয়েছে। এই বিপুল খরচের পরও সরকারি প্রাথমিকে বাড়ছে না শিক্ষার্থী সংখ্যা। অর্জন করতে পারছে না অভিভাবকদের ভরসা।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্যপরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, কিন্ডারগার্টেন আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থা। যুগ যুগ ধরে শিক্ষার্থী বাড়ছে, আরও বাড়বে। সরকারি প্রাথমিকে কোটি কোটি টাকা যে ইনভেস্ট হচ্ছে এটার মনিটরিং দুর্বল। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষকদের নানা প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। যার কারণে তারা পড়ানোতে মনোযোগ দিতে কম পারছেন। এসব কারণে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী বাড়ছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার মান নিয়ে একটা প্রশ্ন তো আছেই। সরকারি স্কুলে বাচ্চারা ভালো করবে কিনা? এটা নিয়ে উদ্বেগ থাকে অভিভাবকদের মধ্যে, পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। বেসরকারি স্কুলে বাচ্চাদের নিয়মিত মূল্যায়ন হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে তিন মাস পরপর বাচ্চাদের আপডেট দেয়া হয়, কিন্তু সরকারিতে তা হচ্ছে না। আবার যদিও হয় দিনের বেলায় অভিভাবকদের ডাকা হয়। যার কারণে কর্মজীবী অভিভাবকরা তাতে যোগ দিতে পারেন না। আমরা চেয়েছিলাম প্রাথমিক ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত হোক। কিন্তু সেটাও হচ্ছে না। শিক্ষক সংকট তো আছেই।
