সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা সারা হোসেনের

সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা সারা হোসেনের

ফন্ট সাইজ:

সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কারের উদ্যোগ এবং সম্প্রতি বক্তব্যের জেরে সাতক্ষীরায় শামীম নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যমান আইনের অপপ্রয়োগ রোধ এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় না এনে কেবল অনলাইন মানহানির মতো বিষয়কে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে নতুন করে পুলিশকে ঢালাও ক্ষমতা দেয়া জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বৃহস্পতিবার মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে সারা হোসেন এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইনের পূর্ববর্তী সংস্করণ (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন)-এ মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নেয়া, ভিত্তিহীন অভিযোগে দীর্ঘ সময় আটকে রাখাসহ বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির ছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা হয় এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারও তা বহাল রাখে। তবে মাত্র ৬ মাসের মাথায় পুনরায় আইনটি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন প্রস্তাবে পুলিশকে যে কাউকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়া এবং ‘অনলাইন মানহানি’কে পুনরায় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিষয়ে সমালোচনা চলছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, সমাজে মানহানির চেয়েও যেখানে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার মতো মারাত্মক অপরাধ ঘটছে, সেখানে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ করার বিষয়টি কতোটা জরুরি।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন আরও বলেন, অনলাইনে বক্তব্যের জেরে সম্প্রতি শামীম নামের এক ব্যক্তিকে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা করার নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তো বিদ্যমান আইনেই ব্যবস্থা নেয়া যেতো। আইনটা পরিবর্তন হয়নি বলে ব্যবস্থা নেয়া যায়নি, বিষয়টি তো এমন না। কিন্তু কখন কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, কাকে সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে, এখানে ভারসাম্যের অভাব রয়েছে। ক্ষমতাবানরা আইনটাকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে জবাবদিহিতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সারা হোসেন বলেন, সাতক্ষীরার ঘটনায় অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে তাকে মারধর করা হয় এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে গিয়েও পুনরায় আক্রমণ করে হত্যা নিশ্চিত করা হয়। এ অবস্থায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারতো কি না, সেই প্রশ্ন তুলে সারা হোসেন বলেন, বারবার বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট আইন আরও কঠোর করা হবে, যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। কিন্তু আইন তো ইতিমধ্যে যথেষ্ট কঠোর। সেটি প্রয়োগ করা হচ্ছে না কেন, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। সিআইডি’র এ ধরনের পোস্ট শনাক্ত করা, পোস্টদাতাকে খুঁজে বের করা এবং তার অবস্থান নির্ণয়ের সক্ষমতা রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে পোস্ট দিয়েছেন, মিছিলে যোগ দিয়েছেন, অন্যরাও মিছিলে এসেছেন এবং সেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও তাদের ধরতে কেউ তৎপর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের নিশ্চয়তা দেয়। কোনো ব্যক্তি কোনো আপত্তিকর বক্তব্য দিলে প্রচলিত আইনে তার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচার প্রক্রিয়ার বিধান রয়েছে। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে জেল বা জরিমানার বিধান থাকলেও কাউকে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে হত্যা বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অধিকার দেয়া হয়নি। গণমাধ্যমে নিহত ব্যক্তি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলে খবর এলেও, তিনি সুস্থ হলেও তাকে আক্রমণ করার কোনো বৈধতা নেই।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ক্ষেত্রে ‘তৌহিদী জনতা’র নাম ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় আড়াল করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন সময়ে (যেমন উত্তরবঙ্গে ১৬-১৭ বছরের এক কিশোরকে ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে নির্যাতন ও দীর্ঘদিন আটক রাখা) এ ধরনের পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে সমাজের মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরি হয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, কোনো কথা বললে অন্য কেউ তার ওপর চড়াও হবে কিংবা তাকে আক্রমণ করতে আসবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজেরাই সমাজে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছে। অথচ তারা যা করতে চাইছে, তা আইন নয়; বরং শক্তি প্রয়োগ।