ম্যাকিয়াভেলিকে নতুন করে চেনা

ম্যাকিয়াভেলিকে নতুন করে চেনা

ফন্ট সাইজ:

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির জন্ম রিপাবলিক অব ফ্লোরেন্সে। সালটা ১৪৬৯। বহুবিভক্ত ইতালির তখনকার অন্য দেশগুলি ছিল মিলান, ভেনিস, নেপলস এবং পোপ-শাসিত রোম। এদের মধ্যে সদ্ভাবের দারুণ অভাব ছিল। তারা নিজেদের ভেতরের শত্রুতা চরিতার্থ করতো বিদেশি শক্তিকে ডেকে এনে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মাধ্যমে। সেই সুযোগে স্পেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির হ্যাপসবার্গ রাজবংশ প্রায়শই ইতালির কোনো না কোনো অংশ কব্জা করে নিত। এছাড়া ফ্লোরেন্সের রাজনৈতিক শক্তিগুলি পরস্পরের সাথে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। তাই সে সময়ের শাসকদেরকে পরামর্শ দিতে ম্যাকিয়াভেলি তাঁর সাড়া জাগানো রাজনৈতিক দর্শনের বই দ্য প্রিন্স রচনা করেছিলেন। তিনি সমগ্র ইতালির একীভূত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন এবং বলেছেন, একজন শক্তিশালী প্রিন্সের কেমন হওয়া উচিত। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রিন্স’ কোনো ব্যক্তি নয়, প্রিন্স মানে— একটা শক্তিশালী দেশপ্রেমিক সরকার।
ফ্লোরেন্সে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে রিপাবলিকান এবং অভিজাত পরিবার ‘মেদিচিদের’ মধ্যে দ্বন্দ্ব চলেছে বহু বছর ধরে। মেদিচি পরিবার ছিল অভিজাততন্ত্রের প্রতিভূ। ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন রিপালিকান মনোভাবাপন্ন রাজনীতিক। ১৪৯৯ সাল থেকে ১৫১২ সাল পর্যন্ত ম্যাকিয়াভেলি ফ্লোরেন্সের রিপাবলিকান সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক দফতরের মুখ্য আধিকারিক ছিলেন। কিন্তু ১৫১৩ সালে মেদিচি পরিবার পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। ম্যাকিয়াভেলিকে তারা পদচ্যুত করে এবং নির্বাসনে পাঠায়। নিজ আবাসস্থল থেকে দূরে নিভৃতে নির্বাসিত জীবনযাপন করার সময়ে ম্যাকিয়াভেলি তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আলোকে দ্য প্রিন্স গ্রন্থ রচনা করেন।
সময়ের দাবি অনুযায়ী ম্যাকিয়াভেলি চেয়েছিলেন এমন শাসক, যিনি দেশের মানুষকে দেশের ভেতরে নিরাপত্তা দিতে পারবেন এবং বাইরের শক্তির আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবেন। ম্যাকিয়াভেলির সময়ে বৃহত্তর ইতালির রাষ্ট্রগুলি অন্য দেশের নাগরিক দিয়ে ভাড়াটে সেনাবাহিনী গঠন করতো। ম্যাকিয়াভেলি দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখতে নিজস্ব নাগরিক নিয়ে শক্তিশালী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। ফ্লোরেন্স এবং সামগ্রিকভাবে ইতালির ভঙ্গুর অবস্থা মোকাবেলার জন্য ম্যাকিয়াভেলি গৎবাঁধা নৈতিকতার বৃত্ত থেকে কিছুটা দূরে সরে যাওয়াকে সমর্থন করেন। তিনি বলেছেন, এন্ড জাস্টিফায়েজ দ্য মিনস্‌ । তাঁর প্রিন্স শেয়ালের মত চতুর ও সিংহের মত সাহসী— তা না হয়ে ভোলাভালা শাসক হলে দুষ্টু লোকেরা তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাবে। তাই রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের দেশগুলি দ্য প্রিন্স গ্রন্থটিকে 'শয়তানের কাজ' বলে আখায়িত করেছে। একজন ফরাসী হুগেনট লেখক, ইনোসেন্ট জেন্টিলেট তাঁর কাউন্টার ডিসকোর্স বইয়ে ১৫৭৬ সালে ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে ক্যারিকেচার লেখেন। তিনি ম্যাকিয়াভেলিকে নির্যাতন ও অপশক্তির শিক্ষক বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর দ্বারা লিখিত ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ শব্দটা নৈতিকতা-বিবর্জিত প্রতারণার সমার্থক শব্দ হতে থাকে। কিন্তু এগুলি ছিল রাজতন্ত্র ও ধর্মতন্ত্রের পক্ষের প্রচারণা। ম্যাকিয়াভেলি সুবিধাবাদী মতবাদের প্রবক্তা হলেও, তাঁর সুবিধাবাদ ছিল সাধারণ জনগণের স্বার্থে—ব্যক্তিস্বার্থে বা দলের স্বার্থে নয় ।

রিপাবলিকান মানসিকতার পক্ষে প্রয়োজনীয়তার মতবাদের জন্য লেখক হিসেবে ম্যাকিয়াভেলি বিশ্ববাসীর কাছে অনন্য অবস্থানে রয়েছেন। আগাগোড়া গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় ভরপুর তাঁর দ্য প্রিন্স গ্রন্থ। ম্যাকিয়াভেলি স্পষ্ট করে বলেছেন যে জনগণের বিরুদ্ধে শাসক কখনো নিজেকে নিরাপদ করতে পারে না, কারণ তারা সংখ্যায় অনেক, পক্ষান্তরে অভিজাত লোকের সংখ্যা কম। ( দ্য প্রিন্স, অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস, পিটার বন্দনেলার ইংরেজি অনুবাদ, পৃষ্ঠা ৩৫ )। ম্যাকিয়াভেলি আরও বলেন, প্রিন্স এর লক্ষ্য হতে হবে জনগণকে খুশি রাখা এবং এ কাজে প্রিন্সের জন্য বড় কোনো প্রতিবন্ধকতাও নেই—কারণ তারা প্রিন্সের কাছ থেকে শুধু এটুকুই চায় যে, প্রিন্স যেন তাদের নির্যাতন না করেন।
ম্যাকিয়াভেলি বাস্তব জগতে মাটির কাছাকাছি এসে প্রিন্সকে চাটুকরদের কাছ থেকে দূরে থাকতে এবং শাসনব্যবস্থা মজবুত রাখার স্বার্থে ভালো লোক বাছাই করতে বলেন। ভালো লোক বাছাইয়ের জন্য ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন—যে লোক প্রিন্সের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থকে সবসময় বড় করে দেখে, সে প্রিন্সের উপযুক্ত উপদেষ্টা নয়। ম্যাকিয়াভেলি আরো বলেন, প্রিন্সকে নাগরিকের সম্পদ কুক্ষিগত করা থেকে বিরত থাকতে হবে—কারণ মানুষ পিতৃশোক ভুলে গেলেও সম্পদ হারানোর শোক সহজে ভোলে না। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫৮) । উল্লেখ্য যে, ম্যাকিয়াভেলি নিজে একজন আপাদমস্তক সৎ কর্মকর্তা ছিলেন । ১৩-১৪ বছর তিনি সুনামের সাথে দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন।
ম্যাকিয়াভেলি তাঁর দ্য প্রিন্স বইখানি তাঁর আদর্শের প্রতিপক্ষ মেদিচি পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য লরেনজো ডি মেডিচিকে উৎসর্গ করেছিলেন । রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিপক্ষের ক্ষমতাধর শাসককে পুস্তক উৎসর্গ করার জন্য ম্যাকিয়াভেলি সমালোচিত হলেও বিষয়টি ম্যাকিয়াভেলির দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তাঁর দর্শন ছিল প্রয়োজনের দর্শন। তিনি চেয়েছিলেন লরেনজো ডি মেডিচি বইটা পড়ুক এবং দেশের উপকারে তাঁর পরামর্শ কাজে লাগুক। উৎসর্গ করার মাধ্যমে বইখানি তার কাছে পৌঁছাবার একটা সহজ উপায় বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি পুরোনো শত্রুকে বন্ধু করার পক্ষে ছিলেন। দ্য প্রিন্স বইয়ের বিংশ পরিচ্ছেদে তিনি বলেছেন, প্রিন্স তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষদের ভেতরে তাঁর অনেক অনুগত মানুষ খুঁজে পাবেন, যারা তাঁর পুরোনো অনুগতদের চেয়ে অধিকতর সেবা দেবে, কারণ তাদের চেষ্টা থাকবে আগের সন্দেহ দূরীভূত করা ।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-চিন্তকেরা সাম্প্রতিক সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এনে রেনেসাঁসের সময়ে রাজতন্ত্র ও ধর্মের নির্মিত খোলস থেকে রাজনৈতিক দর্শনকে বের করে ম্যাকিয়াভেলিকে একজন রিপাবলিকান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মনীষী রুশো দ্য প্রিন্স বইটাকে আখ্যায়িত করেছেন  'রিপাবলিকানদের পুস্তক' হিসেবে। আধুনিক রিপাবলিকানরা ম্যাকিয়াভেলির বিরুদ্ধে আনা নীতিজ্ঞানহীনতার ঢালাও অভিযোগকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তাদের মতে — ব্যক্তিস্বার্থতাড়িত উদারতাবাদের চেয়ে ম্যাকিয়াভেলির দর্শন কমুনিটির কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিকল্প। ম্যাকিয়াভেলির সমালোচকেরা তার উপর যে অনৈতিকতার দায় চাপায়, তার তুলনায় বর্তমান বিশ্বে হরহামেশা বড় দেশগুলি হাজারগুণ বেশি করে চলেছে। তারা প্রতিনিয়ত দুর্বল দেশগুলির সম্পদ লুন্ঠন করছে, কিংবা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে সাধারণের শান্তি বিনষ্ট করেছে। এই দ্বিমুখি নীতি তারা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে নিজ দেশের জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে। সেদিক থেকে ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিবেকের কাছে স্বচ্ছ ছিলেন ।

(প্রবন্ধকার অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এবং লেখক )