মমিনুল ইসলাম মণ্ডল। পরিচিত ‘মইম সুমন’ নামে। বন্ধুদের সঙ্গে প্রতারণা করে এক যুগ আগে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিভাগের সাবেক নেতা হওয়ার সুবাদে সারা দেশের সাংগঠনিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সুযোগকে কাজে
লাগিয়ে নানা কূটকৌশলে এসব টাকা হাতিয়ে নেয় সুমন। বন্ধুকে বিশ্বাস করে বেশির ভাগ ভুক্তভোগী নগদ টাকা হাতে তুলে দেয়। ফলে তাদের হাতে তেমন কোনো ডকুমেন্টও নেই। এসব ভুক্তভোগীদের একজন সুমনের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে টাকা দিয়েছিলেন। ব্যাংকে টাকা জমার ভাউচার দিয়ে সম্প্রতি বগুড়ার আদালতে মামলা হয়।
সময়টা ২০১১ সাল। কাছের বন্ধুদের কাছে ব্যবসার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন। ‘বেঙ্গল শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিঃ’ নামে প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করে। তারপর পর্যায়ক্রমে তেজারা এক্সপোর্ট ইমপোর্ট লিমিটেড, তেজারা প্রপার্টিজসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি খোলে। এসব কোম্পানির পরিচালক পদে নাম দিয়ে সেই বন্ধুদের থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা তোলে। এরপর বন্ধুদের দেখানোর উদ্দেশ্যে ঢাকার গুলিস্তান থেকে নন-ব্র্যান্ডের ৪০-৫০টি টেলিভিশন কিনে সেখানে ‘তেজারা টিভি’ নামে লোগো এবং কার্টন তৈরি করে চায়না থেকে ইমপোর্ট করা হয়েছে বলে ধোঁকা দেয়। বন্ধুরা তার এই প্রতারণা বুঝতে না পেরে বিশ্বাস করে পর্যায়ক্রমে টাকা দিতে থাকে। বছর খানেক এভাবে কয়েকটা প্রতিষ্ঠানে লোকদেখানো কার্যক্রম চালিয়ে একদিন গা ঢাকা দেয়। পরে বগুড়া এসে তার শ্বশুর পীর আব্দুস সোবহানের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কিছুদিন পর সুমনের সন্ধান পাওয়া গেলে টাকার জন্য চাপ দিলে সে তৎকালীন যুবলীগের বগুড়া জেলা সভাপতি শুভাশীষ পোদ্দার লিটনের সঙ্গে আঁতাত করে পাওনাদারদের উল্টো হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
বিষয়টি নিয়ে কিছুদিন আগে বগুড়া জেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলী আদালতে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী ওমর ফারুক। সেই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে বৃহস্পতিবার রাতে বগুড়া সদর থানার পুলিশ প্রতারক সুমনকে শহরের প্রেসপট্টিতে তার দোকান থেকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল বিকালে আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলে প্রেরণ করা হয়।
সুমন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের কিশামত দশনিয়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসাইন মণ্ডলের ছেলে। শ্বশুর বগুড়া শহরের কাটনারপাড়ার ওসমান বিন আব্দুস সোবহান পীর। অতীতে তিনি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
শুক্রবার সকালে সুমনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন চটকদার সমবায় ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষ ও নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। সবশেষ আদালতে দায়ের করা একটি প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালে ‘বেঙ্গল শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিঃ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা আত্মসাৎ করেন সুমন। মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীরা জানান, ব্যবসার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন কৌশলে তাদের সর্বস্বান্ত করেছেন এই প্রতারক।
প্রতারণার শিকার ঢাকার বিশিষ্ট কবি ও প্রচ্ছদ শিল্পী আফসার নিজাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সুমনের মতো ব্যক্তিরা বিশ্বাসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে। সে বিভিন্ন অজুহাতে আমার কাছ থেকেও টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং পরবর্তীতে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। সমন্বয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ বগুড়ার সাবেক পরিচালক নাজমুল আহসান সোহাগ জানান, সাংগঠনিক পরিচয়ের আড়ালে সুমন বিভিন্ন জেলা থেকে সহজ-সরল মানুষের কষ্টের জমানো টাকা সমবায় সমিতির নামে সংগ্রহ করে তা আত্মসাৎ করেছে। আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
নাট্যকার ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বিকল্প’-এর সাবেক পরিচালক এবং সসাসের সাবেক নাট্য সম্পাদক নবার নাসির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই প্রতারকের বিচার চেয়ে আসছিলাম। সে কেবল আমার সঙ্গেই নয়, সংগঠনের বহু নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বড় অঙ্কের প্রতারণা করেছে। এখন আইনের মাধ্যমে তার সঠিক বিচার হওয়া জরুরি।
