যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। তাদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, এনবিআর’র কম্পিউটার অপারেটর, এমনকি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ চক্র পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট দল। এসআরবি জানায়, গত ১০ই অক্টোবর ভোররাত ৪টা ৪৩ মিনিটে এনবিআর’র অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে এনবিআর’র কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান।
এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও এনবিআর’র আরেক কম্পিউটার অপারেটর এসএম ইমদাদুল ইসলামকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য ও তাদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেয়া হয়। এ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম এবং চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন যুক্ত ছিলেন। গত ১৪ থেকে ১৬ই অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি’র মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা প্রশ্নপত্র ফেসবুকের মাধ্যমে পাওয়ার দাবি করলেও এ বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস খুঁজে বের করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানায় এসআরবি। চক্রটি গত ৩-৪ বছর ধরে সরকারি দপ্তরের নিয়োগ জালিয়াতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে জানায় এসআরবি। চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতো। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে লিখিত চুক্তি, ব্যাংক চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করতো চক্রটি। জামানত হিসেবে পরীক্ষার্থীদের মার্কশিট ও সনদপত্র নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ার তথ্যও পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। চক্রটি তৃতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য ৮-১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য ১৫-২০ লাখ টাকা দাবি করতো বলে জানিয়েছে এসআরবি।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), আসাদুল ইসলাম (৩৩), নুর মোহাম্মদ (৩০) ও জাহাঙ্গীর (৩৮)। এদের মধ্যে রুবেল ইসলাম পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, ইমদাদুল ইসলাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর, আসাদুল ইসলাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক এবং নুর মোহাম্মদ এনবিআর’র অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত। অন্যদের মধ্যে মফিজুল ইসলাম চাকরিপ্রার্থী। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১২০টি স্ট্যাম্প, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র, ৪৯টি ব্যাংক চেক ও চেকের পাতা, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন এবং নগদ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও ওইদিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় গত ১১ই অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।
প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে রাত জেগে পাহারা প্রতিমন্ত্রীর: এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আগের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর এবার নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ফল প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া তদারকির ঘোষণা দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। গতকাল বিকালে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সচিবালয়ে রাত জেগে নিজে উপস্থিত থেকে তদারকি করেছেন।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আগের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর এবার এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। আমিনুল হক জানান, কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং তা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ার পথে রয়েছে। শুক্রবারের প্রাথমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর শনিবারের মধ্যে ফল প্রকাশের চেষ্টা চলছে। পরবর্তী সময়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি পদসহ অন্যান্য শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
