বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, পাল্টে যাচ্ছে রাজনৈতিক ভাষা, সামাজিক সম্পর্ক ও আদর্শিক অবস্থানের হিসাবও। একদিকে সংস্কার, গণতন্ত্র ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি; অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহনন এবং উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশ কি সত্যিই উগ্র ডানপন্থার দিকে এগোচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘উগ্র ডানপন্থা’র বয়ানই হয়ে উঠছে নতুন অস্ত্র?
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, বিএনপিবিরোধিতার রাজনীতি করতে গিয়ে সেকুলার সমাজের একাংশ জামায়াত-শিবিরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ডিজিটাল মবের চাপ অনেককে ডানপন্থা থেকে উগ্র ডানপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জামায়াত-শিবির রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে, আর দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথও তৈরি হতে পারে।
মাহফুজের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তিনি শুধু একটি দলের উত্থান নিয়ে কথা বলেননি; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে আদর্শিক মেরুকরণ, কৌশলগত মিত্রতা এবং সামাজিক চাপের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তাঁর আশঙ্কাকে বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বক্তব্য আর প্রমাণিত প্রবণতা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ সত্যিই উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে কি না, তার উত্তর খুঁজতে হলে স্লোগানের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের বাস্তব গতিপথ।
রাজনীতির সুবিধাবাদ, না আদর্শিক পরিবর্তন? বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা রয়েছে, প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে আদর্শিকভাবে দূরের শক্তির সঙ্গেও কৌশলগত বোঝাপড়া। কখনো ক্ষমতার জন্য, কখনো নির্বাচনী হিসাবের কারণে, কখনো আবার কোনো একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ঠেকানোর তাগিদে তৈরি হয় সাময়িক মিত্রতা। কিন্তু এমন মিত্রতার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
মাহফুজ আলমের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে সেকুলার সমাজের একাংশ জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণে সহায়তা করছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা নিছক দলীয় কৌশলের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই অভিযোগ যাচাই করতে হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন, বক্তব্য ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রমাণ দেখতে হবে। কারও বিএনপিবিরোধী অবস্থান মানেই তিনি জামায়াতের মিত্র, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিসংগত নয়।
একইভাবে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা আর দলটির প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উগ্রবাদ হিসেবে চিহ্নিত করাও এক কথা নয়। জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল, শিবির তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আদর্শের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর; ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতার ভিত্তিতে ঢালাও অভিযোগ নয়।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ, ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজ, রক্ষণশীল ভোটার এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের অনুসারীরা একই শ্রেণির নন। তাঁদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করালে প্রকৃত উগ্রবাদ চিহ্নিত করা যেমন কঠিন হয়, তেমনি বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় দূরত্বও তৈরি হয়।
রাজনীতিতে মেরুকরণ যত বাড়ে, ততই এই পার্থক্যগুলো মুছে ফেলার প্রবণতা দেখা দেয়। অথচ বাংলাদেশের প্রয়োজন ঠিক এর বিপরীত। কে কোন মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি অন্যের অধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানকে কতটা সম্মান করেন।
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া ‘দেশ উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে’! এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বিশ্লেষণ হিসেবে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া ‘দেশ উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে’—এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বিশ্লেষণ হিসেবে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মাহফুজ আলমের বক্তব্যে ডিজিটাল মব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ আক্রমণের প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর নিছক মতামত প্রকাশের জায়গা নয়। এটি জনমত গঠন, রাজনৈতিক প্রচার, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা এবং ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণেরও একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র।
এর পরিণতি বিপজ্জনক। কেউ হয়তো নিজের বিশ্বাসের কারণে নয়, বরং অনলাইন আক্রমণ এড়াতে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর ভাষা গ্রহণ করেন। কেউ নীরব হয়ে যান। কেউ আবার প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে নিজের অবস্থান নিরাপদ করার চেষ্টা করেন। এভাবেই জনপরিসরে চরম অবস্থান স্বাভাবিক হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে ডিজিটাল মবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অর্থ জনমতের সমালোচনা বন্ধ করা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের জবাবদিহি চাইবেন, ভুলের প্রতিবাদ করবেন, সমালোচনা করবেন। এটাই স্বাভাবিক। সীমারেখাটি হলো, সমালোচনা যেন হুমকি, মিথ্যা তথ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন কিংবা সহিংসতায় উসকানিতে পরিণত না হয়।
এখানে রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সবারই দায়িত্ব রয়েছে। ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখার সংস্কৃতি কমাতে না পারলে উগ্রতার বিরুদ্ধে লড়াইও শেষ পর্যন্ত আরেক ধরনের উগ্রতার জন্ম দিতে পারে।
জাতিসংঘের ১০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ৩৮তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস একটি বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত আঞ্চলিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। সংগঠনটি ছোট ও বিকেন্দ্রীভূত সেলের পাশাপাশি যোগাযোগ, রসদ ও অর্থায়নের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশকে কাজে লাগিয়ে সংগঠনটির সেল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তবে এই মূল্যায়নকে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কার্যকর একিউআইএস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৩৮তম প্রতিবেদন।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। প্রথমত, জাতিসংঘের সতর্কতাকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক হবে না। দ্বিতীয়ত, দেশে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সেলের তথ্য প্রকাশ্যে নেই বলে সম্ভাব্য হুমকিকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়।
জঙ্গিবাদের প্রশ্নে রাষ্ট্রের কাজ বাঘের গল্প বলে আতঙ্ক ছড়ানো নয়, আবার বাঘ নেই বলে চোখ বন্ধ করে থাকাও নয়। কাজ হলো, বাঘের অস্তিত্ব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং বিপদ দেখা দিলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া।
তবে কোনো দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্য দলের ভুলের ওপরই নির্ভর করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, অতীতের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি, সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং জনগণের আস্থার ওপর। একইভাবে বিএনপি কিংবা জামায়াতের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে তাদের রাজনৈতিক আচরণ, কর্মসূচি ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে।
রাজনৈতিক দলগুলোর তাই নিজেদের স্বল্পমেয়াদি লাভের বাইরে তাকানো দরকার। সংস্কারের নামে প্রতিপক্ষকে বাদ দেওয়া, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো কিংবা সাংস্কৃতিক বিতর্ককে অন্তহীন সংঘাতে পরিণত করা, কোনোটিই স্থিতিশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি হতে পারে না।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে রাজনৈতিক বিতর্ককে শুধু কে জিতবে আর কে হারবে? এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রটি কোন নীতিতে পরিচালিত হবে, নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং ভিন্নমতের মানুষ কতটা নিরাপদে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে পারবেন।
একইভাবে একিউআইএস নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচারের উপকরণ বানানো যাবে না। নিরাপত্তা ও রাজনীতি একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে; তবু তাদের মূল্যায়নের মানদণ্ড আলাদা হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ কেবল ডানপন্থার উত্থান ঠেকানো নয়। চ্যালেঞ্জ হলো, যে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে কর্তৃত্ববাদ, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিস্তার রোধ করা। একই সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
দেশ উগ্র ডানপন্থার ট্রেনে উঠে গেছে কি না, তার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় হয়তো এখনো আসেনি। কিন্তু সেই ট্রেনের ঝুঁকির সংকেতগুলো উপেক্ষা করারও অবকাশ নেই। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দোষারোপের চেয়ে আত্মসমালোচনা বেশি জরুরি, আর নিরাপত্তার প্রশ্নে অনুমানের চেয়ে প্রমাণের মূল্য বেশি।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না কে কাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে পারল। নির্ধারণ করবে, রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা দৃঢ়ভাবে অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা এবং উগ্রবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে পারল, কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ছাড়াই।
বাঘের গল্প বলে মানুষকে ভয় দেখানো যেমন অনুচিত, তেমনি বাঘের পদচিহ্ন দেখেও হাসাহাসি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায় সত্য যাচাই, সময়মতো সতর্কতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। বাংলাদেশের রাজনীতিরও এখন ঠিক এই পরিপক্বতাটুকুই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
