বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। গতকাল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর সোনালী জৈন-চন্দ্র।
এদিকে আওয়ামী লীগ আমলে আইএমএফের সঙ্গে করা ঋণ চুক্তির শর্ত ‘গ্রহণযোগ্য’ মনে না হওয়ায় তা বাতিল করেছিল বর্তমান সরকার। তবে নতুন ঋণের আলোচনাতেও একাধিক শর্তই মানতে হচ্ছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় গতকাল আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ বিষয়ে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, নতুন ঋণের আলোচনাতেও শর্ত আসবে, সেসব শর্ত ‘পূরণও হবে’।
মূলত সংস্থাটির পক্ষ থেকে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, আর্থিক খাতের সুশাসন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। অবশ্য আইএমএফ’র সব শর্ত একই সময়ে পূরণ করতে হয় না। কিছু শর্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করতে হয়, কিছু ক্ষেত্রে পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। ঋণের নতুন কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে এসব শর্ত পূরণের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আইএমএফ’র অন্যতম প্রধান শর্ত হলো- সরকারের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। এ লক্ষ্যে শুল্ক ও কর ছাড় কমিয়ে আনা, মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) আহরণ জোরদার করা এবং আয়কর আদায় বাড়ানোর ওপর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজস্ব নীতিনির্ধারণ থেকে এনবিআরের রাজস্ব প্রশাসনকে পৃথক করার বিষয়টিও শর্তের অন্তর্ভুক্ত।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ কমানো আইএমএফের বড় শর্ত। রাষ্ট্রীয় ও বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্পদ মূল্যায়ন (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ), মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল করতে বিনিময় হারকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ও নমনীয় করার শর্ত রাখা হয়েছে। নির্ধারিত ব্যান্ডের মাধ্যমে ক্রলিং পেগ পদ্ধতির কার্যকারিতা বাড়িয়ে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকে যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সরকারের বাজেট ঘাটতি কমাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দেয়া ভর্তুকি কমিয়ে আনার শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেল ও গ্যাসের দাম নিয়মিত সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) আইনি ক্ষমতা শক্তিশালী করা, স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি করা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ সম্পর্কিত ঝুঁকি পর্যালোচনা জোরদার করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হারকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের এসব শর্ত পূরণ করা সাময়িকভাবে কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করতে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এসব সংস্কার অপরিহার্য।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ঋণের জন্য শর্ত থাকবে, তা পূরণও করতে হবে। কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করা হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে এ কর্মসূচির আওতায় কী ধরনের শর্ত থাকবে এবং সেগুলো কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা হবে। কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো হবে।’ তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশেরও সম্মতি রয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গেও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে বাংলাদেশ।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সংস্কার কৌশল অনুযায়ী সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। দেশের প্রয়োজন ও পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আইএমএফ’র ঋণসহায়তা পেতে বিভিন্ন শর্ত পূরণে কোনো বাধা তৈরি হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. তিতুমীর বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়গুলো এগিয়ে যাবে। সরকার প্রতিটি পদক্ষেপ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তিতুমীর বলেন, আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনের বিষয়ে আশাবাদী।
আইএমএফ’র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর সোনালী জৈন-চন্দ্র বলেন, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার যথাসময়ে বাস্তবায়ন জরুরি। বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে আইএমএফ এবং অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে সংস্থাটি।
