যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে। আগস্টে এটা ছিল ৩.৪ শতাংশ। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম মন্ত্রণালয়ের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএলএস) প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। মাসিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে পণ্যের দাম বেড়েছে ০.৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি এ মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার বাড়ানোর আশঙ্কা জোরালো করেছে। একই সঙ্গে আগামী ৩রা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে চাপে পড়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বেড়েছে ৯.১ শতাংশ। বিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, মাসিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে পেট্রলের দাম বাড়ার কারণে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় পেট্রলের দাম বেড়েছে ৩৪.২ শতাংশ। অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ কাইল মুর আল জাজিরাকে বলেন, ইরানে লক্ষ্যহীন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে। পেট্রলের দাম এখনও ঊর্ধ্বমুখী। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন জ্বালানির দাম পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪.৩৩ ডলার। এক মাস আগে এ দাম ছিল ৪.৩১ ডলার। অন্যদিকে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬.২৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক মাস আগে ছিল ৬.২৩ ডলার।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্যাট্রিক ডিহান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত গ্যালনপ্রতি পেট্রলের গড় দাম ৪ ডলারের ওপরে থাকার দিনসংখ্যা আগের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে- ১৫৮ দিন। জ্বালানির পাশাপাশি আবাসন ব্যয়ও মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রেখেছে। আগস্টে আবাসন ব্যয় ০.৩ শতাংশ বাড়লেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়েছে ০.৪ শতাংশ। তবে খাদ্যপণ্যের দাম সামগ্রিকভাবে অপরিবর্তিত থাকায় প্রতিবেদনে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। রেস্তোরাঁয় খাওয়াসহ বাড়ির বাইরে খাবারের দাম বেড়েছে ০.২ শতাংশ। তবে বাড়িতে খাওয়ার জন্য কেনা খাদ্যপণ্যের দাম ০.১ শতাংশ কমায় এ বৃদ্ধি পুষিয়ে গেছে।
মুদি দোকানে মুরগির মাংসের দাম বেড়েছে ০.৭ শতাংশ, ফল ও সবজির দাম ০.৫ শতাংশ এবং জুসের দাম ১.১ শতাংশ। বিপরীতে দুধের দাম কমেছে ২.১ শতাংশ এবং গরুর মাংসের দাম কমেছে ০.৯ শতাংশ। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগের প্রভাব পড়েছে কম্পিউটার সফটওয়্যার ও আনুষঙ্গিক পণ্যের বাজারেও। এক বছর আগের তুলনায় এসব পণ্যের দাম বেড়েছে ২৮ শতাংশ। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান প্যারাবেলাম ইনভেস্টমেন্টের প্রধান রামি ক্যাসিস বলেন, এআইয়ের উত্থান এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। ডাটা সেন্টার, এআই প্রতিষ্ঠান ও মডেল তৈরিতে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের খবর আমরা সবাই পড়েছি।
মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন এ মাসের শেষ দিকে সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ফেডারেল রিজার্ভ। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩.৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করে। তিন বছরের মধ্যে এটি ছিল প্রথম সুদের হার বৃদ্ধি। এবারও সুদের হার বাড়ানো হবে, নাকি বর্তমান অবস্থায় রাখা হবে- এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সিএমই ফেডওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, সুদের হার ৩.৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা ৫২.৯ শতাংশ। অন্যদিকে আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৪ থেকে ৪.২৫ শতাংশে নেওয়ার সম্ভাবনা ৪৭.১ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির এই খবর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। সম্প্রতি রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন। মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা গেছে। নাসডাক সূচক কমেছে ০.৮ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ০.৬ শতাংশ। তবে দিনের মধ্যভাগে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ সূচক মোটামুটি অপরিবর্তিত ছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার এবং জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় এই তিনটি বিষয় এখন মার্কিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এসব চাপ সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকানদের ওপর নজর রাখছেন বিশ্লেষকরা।
