‘যৌন শিকারি’ রাসেল ব্র্যান্ড! ধর্ষণ মামলার বিচার শুরু

‘যৌন শিকারি’ রাসেল ব্র্যান্ড! ধর্ষণ মামলার বিচার শুরু

ফন্ট সাইজ:

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মামলায় বৃটিশ অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী রাসেল ব্র্যান্ডকে নির্দয় ও যৌন শিকারি হিসেবে বর্ণনা করেছেন সরকারি কৌঁসুলিরা। বুধবার লন্ডনের আদালতে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মামলার বিচার শুরু হয়েছে। ৫১ বছর বয়সী এই অভিনেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের তিনটি, যৌন নিপীড়নের তিনটি এবং অশালীন যৌন নিপীড়নের একটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ছয় নারী এসব অভিযোগ করেছেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের মধ্যে ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। তবে রাসেল ব্র্যান্ড তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে বিচার শুরুর দিন সরকারি কৌঁসুলি রিয়েল কারমি-জোনস কেসি বলেন, অভিযোগকারী নারীরা একে অপরকে চিনতেন না। তাদের মধ্যে কখনো দেখাও হয়নি। তারা প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে নিজেদের অভিযোগ নিয়ে সামনে এসেছেন। কৌঁসুলি বলেন, অভিযুক্তের কর্মজীবন যেমন বিচিত্র ও বিস্তৃত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর পরিস্থিতিও তেমনই বিচিত্র। তিনি আরও বলেন, নারীরা কারা, তারা কী বলেছেন কিংবা কী করেছেন- কোনো কিছুই ব্র্যান্ডকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। আদালতে কৌঁসুলি বলেন, কোনো না কোনো ধরনের যৌন সংস্পর্শের প্রতি তার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা ছিল নির্বিচার ও অতৃপ্ত। বিচারকদের উদ্দেশে কৌঁসুলি বলেন, ব্র্যান্ড যখন নিজের প্রয়োজন মেটাতে চাইতেন, তখন তিনি ভালো ব্যবহার করতেন, নিঃসন্দেহে হাস্যরসিক ছিলেন, আকর্ষণীয় ও এমনকি বেশ পছন্দনীয় আচরণও করতেন।

তবে তার অন্য রূপও ছিল বলে অভিযোগ করেন কৌঁসুলি। তার ভাষায়, ব্র্যান্ড ছিলেন দাবিদার, নিজের অধিকার সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী এবং প্রবল যৌন আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন এক ব্যক্তি। নিজের প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ হওয়া উচিত। এমন শিশুসুলভ প্রত্যাশাও তার মধ্যে ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। কৌঁসুলির দাবি, যৌন সংস্পর্শের ঘটনাগুলোর পর ব্র্যান্ডকে প্রায়ই নির্বিকার, স্বাভাবিক ও বিচলিত নন বলে মনে হতো। কখনো তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যেতেন, কখনো চলে যাওয়ার জন্য অজুহাত তৈরি করতেন। আবার কখনো এমন আচরণ করতেন, যেন কিছুই ঘটেনি।

বুধবার আদালতে ছয় অভিযোগকারীর বক্তব্য ও তাদের অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রথম অভিযোগকারী নারী জানিয়েছেন, ১৯৯৯ সালে রাসেল ব্র্যান্ডের পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ওই নারী লেবার পার্টির সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে সম্মেলনের মূল কর্মসূচির বাইরে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ব্র্যান্ডের সঙ্গে তার কথা হয়। পরে ব্র্যান্ড তাকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। কৌঁসুলি আদালতকে জানান, ধর্ষণের এই অভিযোগ নিয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ব্র্যান্ড বলেন, ঘটনাটি ঘটে থাকলেও তার তা মনে নেই। তিনি আরও বলেছিলেন, প্রথম অভিযোগকারী নারীর নাম তার মনে নেই এবং তিনি কখনো কারও সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কে জড়াননি।

দ্বিতীয় অভিযোগকারী নারী সে সময় এমটিভিতে কাজ করতেন। তার অভিযোগ, ব্র্যান্ড তাকে অশালীনভাবে যৌন নিপীড়ন করেন। ওই নারী জানিয়েছেন, ব্র্যান্ড তার কাছে শৌচাগারের অবস্থান জানতে চান। তখন তিনি তাকে শৌচাগার দেখিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। কৌঁসুলির ভাষ্য অনুযায়ী, শৌচাগারের কাছে পৌঁছানোর পর ব্র্যান্ড নারীটিকে ভেতরে আসতে বলেন এবং তার বাহু চেপে ধরেন। নারীটি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করেন এবং পেছনে সরে গিয়ে বাধা দেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, তখন ব্র্যান্ডের চোখেমুখে ছিল মরিয়া ও বেপরোয়া ভাব। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘দয়া করে, দয়া করে ভেতরে আসুন- আরে, আসুন না।’
তৃতীয় অভিযোগকারী নারীর দাবি, ২০০৪ সালে একটি পার্টিতে রাসেল ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি তাকে শৌচাগারে নিয়ে ওরাল সেক্সে লিপ্ত হন। আদালতে কৌঁসুলি বলেন, পরিচয়ের এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে কথোপকথন চলার সময় ব্র্যান্ড হঠাৎ ওই নারীর দিকে ঝুঁকে তার বুক চেপে ধরেন। এ সময় তার মুখে ‘বড় ও অদ্ভুত এক হাসি’ ছিল বলে ওই নারী জানিয়েছেন। এরপর ব্র্যান্ড তার বাহু ধরে শৌচাগারের দিকে টেনে নিয়ে যান বলে অভিযোগ। ওই নারী আরও জানিয়েছেন, তারা যখন গাড়িতে করে অন্য একটি স্থানে যাচ্ছিলেন, তখন ব্র্যান্ড তার সঙ্গে ওরাল সেক্সে লিপ্ত হন।

চতুর্থ অভিযোগকারী নারীর দাবি, ২০০৪ অথবা ২০০৫ সালে ক্যাপিটাল রেডিওতে ব্র্যান্ড তাকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরেন। এরপর ‘অপরিচ্ছন্ন ও আক্রমণাত্মকভাবে’ চুমু খান এবং তার শরীরের দুই পাশ ও নিতম্ব জোরে চেপে ধরেন। কৌঁসুলি জানান, নারীটি শেষ পর্যন্ত ব্র্যান্ডকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন। এরপর ব্র্যান্ড এমনভাবে মুচকি হেসেছিলেন, যেন পুরো ঘটনাটি নিছক একটি রসিকতা।

পঞ্চম অভিযোগকারী নারী জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে লন্ডনের হ্যামারস্মিথ অ্যাপোলোতে ব্র্যান্ডের একটি অনুষ্ঠান চলাকালে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। কৌঁসুলি বলেন, তাদের মধ্যকার প্রথম যৌন সংস্পর্শে সম্মতি ছিল। কিন্তু পরবর্তী এক ঘটনায় ব্র্যান্ড ওই নারীকে অন্যায় উপায়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। আদালতকে জানানো হয়, ওই নারী মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর নিজেকেই ঘটনার জন্য দায়ী করে এসেছেন। এর ফলে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে যান। পরের গ্রীষ্মে একটি অনুষ্ঠানে ওই নারীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ব্র্যান্ড তাকে একটি খুদে বার্তা পাঠান। তাতে লেখা ছিল, ‘আমি তোমাকে আরও দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই।’ জবাবে ওই নারী লিখেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, তুমি আমাকে যথেষ্ট দূর পর্যন্ত নিয়ে গেছ- তুমি আমার সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করেছ।’ অভিযোগ অনুযায়ী, ব্র্যান্ড জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি দুঃখিত।’

ষষ্ঠ অভিযোগকারী নারী ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, ২০০৯ সালে কাজের দায়িত্ব পালন করার সময় ব্র্যান্ড তাকে ম্যাসাজ করে দিতে বলেন। কৌঁসুলির ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ব্র্যান্ড হাঁটু গেড়ে বসে সরাসরি ওই নারীর কোলে মাথা রাখেন।

ছয় নারীর মধ্যে শেষ দুজনের বক্তব্য উপস্থাপনের পর কৌঁসুলি জানান, ২০২৩ সালে পুলিশকে ব্র্যান্ড বলেছিলেন, তিনি কখনো কারও সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কে জড়াননি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো একটি মানহানিকর প্রামাণ্যচিত্র এবং পরবর্তী সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশের পর নতুন করে তৈরি করা হয়েছে অথবা কল্পনা থেকে এসেছে বলেও তিনি দাবি করেছিলেন।
বুধবার বিকেলে আদালতে প্রথম সাক্ষ্য দেন ব্র্যান্ডের সাবেক ফ্ল্যাটমেট মার্ক পিনেইরো। পিনেইরো বিচারকদের জানান, ১৯৯৯ সালে লেবার পার্টির সম্মেলনে যাওয়ার সময় এক নারীর বিষয়ে ব্র্যান্ড তাকে বলেছিলেন, হয়তো তিনি ‘একটু বেশিই করে ফেলেছিলেন’।