কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন, তোলপাড়
এলসি লি

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন, তোলপাড়

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন নিয়ে তোলপাড় চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দায়ী সাব্যস্ত ১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দু’জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে সেখানে। বাকি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্ধেকের শাস্তি ছিল কেবল অতিরিক্ত পড়াশোনার কর্মসূচিতে অংশ নেয়া, প্রবন্ধ লেখা কিংবা লিখিত সতর্কবার্তা। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আইভি লিগভুক্ত মর্যাদাপূর্ণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে চার বছরে যৌন নিপীড়নের ৫১টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, চার সদস্যের একটি প্যানেল ১৫ জন অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়। আরও ১৯টি অভিযোগ পরে খারিজ করা হয় অথবা অভিযোগকারীরা প্রত্যাহার করে নেন। একজনকে তুলনামূলক কম গুরুতর অপরাধে দায়ী সাব্যস্ত করা হয়। সব মিলিয়ে ১৬ জন শিক্ষার্থী যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দায়ী সাব্যস্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে, তাদের মধ্যে মাত্র দু’জনকে বহিষ্কার করা হয়।

সম্প্রতি সাত ভ্রাতৃসংঘের সদস্যের বিরুদ্ধে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়টির যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত ও শাস্তি দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই এসব তথ্য সামনে এল। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দায়ী সাব্যস্ত বাকি ১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে সাতজনকে কেবল লিখিত তিরস্কার, শৃঙ্খলাজনিত পরীক্ষাকাল, নির্ধারিত পড়াশোনার কর্মসূচি অথবা অভিযোগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ছয়জনকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। আরেকটি মামলার বিষয়ে আপিলের নিষ্পত্তি তখনো বাকি ছিল। এসব ঘটনার কোনোটি নিয়ে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। ২০২৪ সালের আলোচিত ‘কর্নেল সেভেন’ দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভের অন্যতম কারণও এটি।

সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় গোপন রাখা কর্নেলের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, তার অভিযোগ ছিল, এক শিক্ষার্থী তাকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন। এর এক বছর আগে ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আরেক নারীকেও নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল। তিনি আরও বলেন, কোনো শাস্তি নেই। কোনো প্রবন্ধ লিখতে হয়নি। ক্ষমাও চায়নি। তাকে স্নাতক হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। ওই নারী এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি লজ্জিত। কেসি লি নামের আরেক শিক্ষার্থীও নিজেকে ‘প্রতারিত’ মনে করার কথা জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, তাকে যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হলেও শাস্তি হিসেবে কেবল একটি আত্মসমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখতে বলা হয়েছিল। লি সিএনএনকে বলেন, সবকিছুর মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর জবাবদিহির যে ধারণা তৈরি করা হয়েছিল, তা যে নিছকই একটা ভ্রম, এটা বুঝতে পারা আরও বেশি কষ্টের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, কর্নেলের একটি শৃঙ্খলা প্যানেল ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছিল, তার আচরণে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। তবে তার কাজ বিদ্বেষপূর্ণ উদ্দেশ্যে করা হয়নি বলেও প্যানেল মন্তব্য করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, সম্মতিভিত্তিক যৌন সম্পর্ক এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হলে ভবিষ্যতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর একই ধরনের অসদাচরণে জড়ানোর আশঙ্কা কমতে পারে। লি বলেন, প্যানেলের সিদ্ধান্ত পড়ে তার মনে হয়েছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যেন কেবল ‘বাড়তি একটি বাড়ির কাজ’ দেয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, একভাবে তারা আমাকে বলছিল, ঘটনাটি যথেষ্ট গুরুতর ছিল না। আমার কষ্টের মূল্য কি শুধু একটি প্রবন্ধ? লি আরও জানান, ওই অভিজ্ঞতার পর তিনি মানসিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি। খাবার এড়িয়ে চলতেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের পড়াশোনার একটি ঐচ্ছিক বিষয় ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

মামলাগুলোর এই বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মাইকেল কটলিকফের ব্যাপক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ঘোষণার এক দিন পর। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ভ্রাতৃসংঘের পার্টি নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও রয়েছে। ২০২৪ সালের ‘কর্নেল সেভেন’ ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সাত ভ্রাতৃসংঘের সদস্যের বিরুদ্ধে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পরও কোনো অভিযোগ দায়ের না হওয়ায় হতাশ হয়ে অভিযোগকারী জেন ডো মামলা করেন। তার দায়ের করা মামলার পরই বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট কটলিকফ স্বীকার করেছেন, কর্নেলে ‘অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন’ আনতে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ভালো করতে হবে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে জেন ডো যে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমাদের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধরনের যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এতে আমি হতবাক।