যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘অর্থনীতিতে শুধুই দুঃসংবাদ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনীতিতে চারদিক থেকে শুধুই দুঃসংবাদের আলামত দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন হাহাকার করছেন, সেই সময়ে আরও কিছু নেতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মঙ্গলবার প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে। প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি)। এদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে, অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থায় ছিল রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। কিন্তু সৌদি আরব ও হুথিদের হামলা-পালটা হামলার কারণে সেখানেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অবস্থা উত্তরণ সহজ নয়। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই সাহসী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন যুগান্তরকে বলেন-আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাস একসঙ্গে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি-দুদিকেই চাপ বাড়ছে। বিনিয়োগ না বাড়লে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টির গতি দুর্বল থাকবে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, আমরা কঠিন সময় পার করছি।
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অর্থনীতির সংকটের কথা আমরা আগে থেকে বলে আসছি। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে-বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আমাদের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টেও এ রকমই তথ্য আসছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। আমরা যা চিন্তা করছি তারচেয়েও বেশি খারাপ। দেশে বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান বাড়ছে না। তিনি বলেন, মানুষের হাতে কাজ নেই। ফলে বাড়ছে না সরকারের রাজস্ব আয়। ৩ বছর আগে থেকে সরকার ঋণ নিয়ে চলছে। আবার ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ করছে। অর্থনীতির জন্য এটি অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এ অবস্থায় সরকারকে বেশ কয়েকটি শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মতে, প্রথমত বিনিয়োগের জন্য সুদহার কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত সরকারি কোম্পানিগুলো হয় অকশনে দিতে হবে, না হয় শেয়ারবাজারে ছাড়তে হবে। তৃতীয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মতো ঢাকা বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্বও বিদেশি কোম্পানিকে দিতে হবে। এর বাইরে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সুযোগ নেই। এজন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে মঙ্গলবার নতুন পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। এতে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে আইএমএফ পূর্বাভাসে বলেছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।৩ মাস পর জুলাইয়ে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের কথা বলেছিল। এবার তা আরও কমিয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের বাজেটে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইভাবে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ রাখার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাতে কী? বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পূর্বাভাসও কমেছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পূর্বাভাস দিয়েছে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধির প্রায় কাছাকাছি। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য তা একেবারেই কাম্য নয়।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন যুগান্তরকে বলেন-আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাস একসঙ্গে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি-দুদিকেই চাপ বাড়ছে। বিনিয়োগ না বাড়লে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টির গতি দুর্বল থাকবে। জ্বালানির ঘাটতি শিল্প ও পরিবহণ ব্যয় বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তবে সঠিক নীতি গ্রহণ ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অপচয় কমানো এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগানো দরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সামষ্টিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও নিু আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের জন্য নীতির পূর্বানুমেয়তা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা জরুরি। রেমিট্যান্সের বৈধ পথ সহজ ও সাশ্রয়ী করা প্রয়োজন। কর আদায় বাড়িয়ে জরুরি সামাজিক ও উৎপাদনমুখী ব্যয়ে সম্পদ দিতে হবে। বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করলে আস্থা ফিরতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির নেতিবাচক অবস্থার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি সংকট। কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা, বিদ্যুৎ ও পরিবহণ ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের ওপর চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার দামে; যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়াও বিনিয়োগে নীতিবাচক অবস্থা, মানুষের কর্মসংস্থানে ঘাটতি এবং রাজস্ব আয় কমছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি উঁচুতে থাকার পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নিলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন-আমরা কঠিন সময়ে পার করছি। দেশে বিনিয়োগ নেই, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সবাই এটি স্বীকারও করছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো-অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য বহুমুখী চেষ্টা চলছে। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জ্বালানি সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে। বিকল্প উপায়ে কীভাবে জ্বালানি আনা যায় সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি সরকার ও বেসরকারি খাতসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।
তবে কারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করা হলেও ব্যবসায়ীদের অনেকের অভিযোগ, এই ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত দেওয়া হয়েছে। ওই শর্ত মেনে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না। ফলে এ পর্যন্ত মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। এক্ষেত্রে শর্ত সহজ করতে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় বৈঠকে ‘ওয়াল স্ট্রিটের’ ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ১৮ কোটির বেশি মানুষের বিশাল বাজার। রয়েছে তরুণ ও কর্মঠ জনগোষ্ঠী এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্ব এ দেশকে বড় উৎপাদন ও তৈরি পোশাকের কেন্দ্র হিসাবে জানে। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখন আরও বিস্তৃত। জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, উৎপাদন, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য। এজন্য সরকার বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ করতে কাজ করছে।
এদিকে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বৈশ্বিক সংকট সামনে আসে। এবারের বাজেটেও ইশতেহারের প্রতিফলন আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার বা এক হাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও এই লক্ষ্য সামনে এনে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিবছর গড়ে ৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সেটি একেবারে অসম্ভব। বিদায়ি বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা সাড়ে ৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নেও জিডিপির ২৫ শতাংশের উপরে বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার।
অর্থনীতির ইতিহাস বলে-জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা চীনের মতো দেশগুলো দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির আকার বাড়িয়েছে। তাদের সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বেসরকারি খাতকে কেন্দ্র করে প্রবৃদ্ধির কৌশল। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটতে চায়। সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো বিনিয়োগের ইঞ্জিন পূর্ণগতিতে চলবে কিনা। এর জবাব মিলবে আগামী কয়েক বছরের বিনিয়োগ পরিবেশ, সংস্কারের গতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ওপর।
প্রথম আলো
‘শিশুদের হামের টিকাদানে ব্যর্থতা’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির বিলম্বকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের দলটি বলেছে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায়
উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের হাম শনাক্ত ৭৩%। সরকার বলছে ১১%। বর্তমান সরকারের সাড়াও ছিল অপর্যাপ্ত। তারা শিশুদের টিকাদানে বাংলাদেশের ব্যর্থতা পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দলটি সতর্ক করেছে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার মতো অন্য রোগেরও প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। টিকাদানে স্থানীয় পরিকল্পনার ঘাটতি সংশোধন, জনবলের শূন্য পদ পূরণ এবং টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে তারা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই মূল্যায়নের তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, টিকা পরিস্থিতি, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয় অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সরবরাহ ও বিতরণের বৈশ্বিক জোট গ্যাভির প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইপিআইয়ের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল (জয়েন্ট ইনডিপেনডেন্ট রিভিউ টিম)। বিশেষজ্ঞদের দলটি বলেছে, টিকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম টিকিয়ে রাখা কঠিন। হামের প্রাদুর্ভাব তার স্পষ্ট সতর্কতা।
আন্তর্জাতিক ও দেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত মূল্যায়নে দলে মোট নয়টি উপদল ছিল। এর একটি ছিল জাতীয় দল। বাকি আটটি ছিল বিভাগীয় দল। প্রতিটি বিভাগীয় দল দুটি করে জেলার দুটি করে উপজেলার তথ্য সংগ্রহ করে। দলগুলো টিকাদান কেন্দ্র, টিকাকেন্দ্র থেকে ফেরত যাওয়া মায়েদের সাক্ষাৎকার, সদ্য মা হয়েছেন এমন ১০ জন করে মায়ের সঙ্গে কথা বলা, স্কুল ও মাদ্রাসা পরিদর্শন এবং পাঁচটি করে পরিবারে মা ও মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেছে। ৭০ জনের দলটি ৩ অক্টোবর কাজ শুরু করে।
গতকালের অনুষ্ঠানটি ছিল মূলত একটি কর্মশালা। এতে অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের প্রধান ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার। এই জনস্বাস্থ্যবিদ ২০ বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ করেছেন। এ ছাড়া আটটি বিভাগীয় দলের পক্ষ থেকেও আটটি পৃথক উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
গতকালের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শিশুদের যে টিকা দেওয়া হচ্ছে, সেই টিকার মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া দরকার। কোথায় টিকা তৈরি হচ্ছে, সেখান থেকে টিকা কোন গুদামে যাচ্ছে, গুদাম থেকে কোন ফ্লাইটে করে কেমন বিমানবন্দরে আনা হচ্ছে, বন্দর থেকে কীভাবে টিকা জেলা পর্যায়ে যাচ্ছে, টিকাকেন্দ্রগুলোতে তা কীভাবে পৌঁছাচ্ছে—এই পুরো ব্যাপারটিতে ‘কোল্ড চেইন’ ঠিক থাকছে কি না, তা জানা দরকার। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা ধারণা করি টিকার মান ঠিক আছে। এটা ধারণা। কিন্তু আমি আপনাদের অনুরোধ করি, টিকার মানও যাচাই করা দরকার।’
হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ
মূল উপস্থাপনায় যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের প্রধান ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচির ইতিহাস তুলে ধরেন এবং কোন রোগ প্রতিরোধে কোন টিকা দেওয়া হয়, তার বর্ণনা দেন। তিনি দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারাই হামে আক্রান্ত হয়েছে, যারা টিকা পায়নি। সব শিশু টিকা না পাওয়ার ঘটনা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিল, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যে ছিল, তা স্বাধীন মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার বলেন, ২০২৬ সালে প্রাদুর্ভাবের আগে শিশুদের মধ্যে ইমুনাইজেশন গ্যাপ (রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি) তৈরি হয়েছিল। নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে প্রতিবছর কমবেশি ২০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল—এই পাঁচ বছরে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হামের টিকা পায়নি। ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যায়।
ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার তাঁর উপস্থাপনায় দেখান, সর্বশেষ হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালে। হাম-রুবেলার পরবর্তী ক্যাম্পেইন ২০২৪ সালের জন্য বাকি ছিল। ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার সেই ক্যাম্পেইন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল; কিন্তু হয়নি। ২০২৫ সালে টাইফয়েডের টিকার ক্যাম্পেইন হয়েছিল। হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২৬ সালের এপ্রিলে। প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার একটি কারণ হাম-রুবেলার ক্যাম্পেইনের এই বিলম্ব।
প্রাদুর্ভাবের আরও কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গার। তিনি বলেন, দেশের অধিক জনঘনত্ব এবং সামাজিক জমায়েতও হাম প্রাদুর্ভাবের কারণ। টিকা দেওয়া হচ্ছে ৯ মাস বা তার বেশি বয়সীদের; কিন্তু ৯ মাসের কম বয়সীরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
এই স্বাধীন মূল্যায়ন দল হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডেরও মূল্যায়ন করেছে। তারা বলেছে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের কর্মকাণ্ড ছিল অপর্যাপ্ত। সরকার সাড়া দিয়েছে লম্বা সময় ধরে। হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সব মানুষকে টিকার আওতায় আনেনি। যেমন ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় নেওয়া হয়নি।
হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগী এবং নিশ্চিত হামের রোগীর যে হিসাব সরকার দিচ্ছে, তারও প্রচ্ছন্ন সমালোচনা দেখা যায় উপস্থাপনায়। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা ৯৩ হাজার ৮৫২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে ৬৮ হাজার ৮৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে হাম শনাক্ত হচ্ছে ৭৩ শতাংশের। সরকারের হিসাবে এই হার অনেক কম।
যেমন গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত সারা দেশে হাসপাতালে সন্দেহভাজন হামের রোগী এসেছে ২ লাখ ৮ হাজার ৫৭০ জন। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২ হাজার ৮৪০ জনের। সন্দেহভাজনদের মধ্যে শনাক্ত রোগী ১১ শতাংশ। গতকাল হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই নিয়ে হামে এ বছর ১ হাজার ১৭৭ জনের মৃত্যু হলো।
দুর্বলতা কোথায়
স্বাধীন মূল্যায়ন দল বলছে, বাংলাদেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যে দুর্বল হয়ে পড়ছে, তার একটি সতর্কবার্তা হচ্ছে হামের প্রাদুর্ভাব। এটি একটি পরীক্ষা। যদি জরুরি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তা হলে হুপিং কাশি ও ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমনকি পোলিও দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের টিকাদানের স্থানীয় পরিকল্পনা দুর্বল বলে উল্লেখ করা হয় মূল্যায়ন দলের উপস্থাপনায়। এতে বলা হয়, এই দুর্বলতার কারণে দেশের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু পদ্ধতিগতভাবে টিকা থেকে বাদ পড়ছে। একজন টিকাকর্মীকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি রেকর্ড সংরক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়েরও কাজ করতে হয়। টিকা কর্মসূচিতে পুষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। টিকা দেওয়ার সময় কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি তেমন থাকে না।
মূল্যায়ন দল বলেছে, ইপিআইয়ের জনবলের ব্যাপক ঘাটতি আছে। যেমন কোল্ডচেইন ঠিক রাখা টেকনিশিয়ানদের ৫৩ শতাংশ পদ খালি, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারী ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৩৪ শতাংশ পদ খালি। এ ছাড়া ইপিআই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ৪৫ শতাংশ পদ খালি। শহর এলাকায় ৯০ শতাংশ টিকাকর্মী এনজিওর, এদের কাজে নজরদারি ব্যবস্থা খুব দুর্বল। এ ছাড়া ২০২৫ সালে সাত মাস টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল টিকাকর্মীদের কর্মবিরতির কারণে।
এখন করণীয় কী
টিকা দেওয়ার জন্য স্থানীয় পরিকল্পনা নতুনভাবে করতে হবে। এই পরিকল্পনা হতে হবে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত। বিভিন্ন স্তরে যত শূন্য পদ আছে, সেগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের সীমা বাড়াতে হবে। টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্যাভির সহায়তার সময় পার হলে কীভাবে টিকা কেনা হবে, সেই পরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।
এ ছাড়া টিকার ক্ষেত্রে যারা সহায়তা দেয় তাদের কাজের সমন্বয়, শহরের এলাকায় বিশেষ নজর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। স্কুলে ঢোকার সময় শিশুর সব টিকা নেওয়া আছে কি না, তা জানার ব্যবস্থা চালু করারও সুপারিশ করেছে এই স্বাধীন মূল্যায়ন দল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এস এম জিয়া উদ্দিন হায়দার বলেন, সিভিল সার্জনরা সমস্যাগুলো ঠিকমতো জানেন। সিভিল সার্জনরা নিজ নিজ জেলায় টিকার কাজ ঠিকঠাক করলে সমস্যা অনেক দূর হবে।
বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি দুঃখ প্রকাশ করেন। গ্যাভির প্রতিনিধি ডিয়ার্ক গেহল বলেন, শহর এলাকায় অনেক মানুষ টিকার বাইরে থাকে, যা সহজে বোঝা যায় না। শহর এলাকায় টিকা কার্যক্রমকে জোরদার করতে হবে।
ঢাকায় ইউনিসেফের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিনিধি গ্লিইয়ান মোলসোপ বলেন, বাংলাদেশের টিকার উজ্জ্বল ইতিহাস থাকার পরও ২০২৬ সালের ঘটনাটি (হামের প্রাদুর্ভাব) দুঃখজনক। টিকা কারা পাচ্ছে, তা জানার একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল বলেন, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের টিকা ব্যবস্থা ভালো বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ভিত্তি দৃঢ়। এই ভিত্তিকে আধুনিকায়ন করা জরুরি।
গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী জিয়া উদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, বিগত সময়ে শিশুদের টিকাদানে যেসব ঘাটতি ছিল, ভবিষ্যতে সেগুলো যেন না হয়, সে বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
কালের কণ্ঠ
‘অর্থনীতির স্বস্তির সূচকেও শঙ্কা’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি নিয়ে নানা নেতিবাচক পূর্বাভাসের মধ্যেও স্বস্তির জায়গা রেমিট্যান্স। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে যখন দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট, তখন প্রবাসী কর্মীদের ঘামে-শ্রমে অর্জিত আয়ে রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, শিল্প খাতের শ্লথগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানি আয়েও যখন ধীরগতি, তখন বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাস আয়। কিন্তু সেই স্বস্তির জায়গাতেও ঝুঁকি তৈরি করেছে সৌদি আরবের বর্তমান সংকট। সৌদিতে হুতিদের হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনায় দেশের প্রধান শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রিয়াদে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় গভীর উদ্বেগে রয়েছেন সৌদিগামী প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী। তাঁদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
শ্রমবাজার বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একদিকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগ সংকুচিত হতে পারে, অন্যদিকে প্রবাস আয়ের প্রবাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ আসে। ফলে দেশটিতে কর্মসংস্থান ও বিমান চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু প্রবাসী পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, আমদানি সক্ষমতা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। দুঃসময়েও রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এসেছিল ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে প্রবাস আয় বেড়েছে ১৭.৩০ শতাংশ।
এই প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রবাস আয়ের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সৌদি আরব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের ১৬.১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব থেকে এসেছে প্রায় ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এ সময় মোট রেমিট্যান্সে দেশটির অংশ বেড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে শক্তি ও ঝুঁকি। সৌদি আরবের শ্রমবাজার সচল থাকলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করে। বিপরীতে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে কর্মসংস্থান, নতুন শ্রমিক পাঠানো এবং নিয়মিত আয় দেশে আসার ধারায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন সংকটময় সময় পার করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাস আয় ও শ্রমবাজারেও নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেলেও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও নতুন শ্রমবাজার তৈরি না হওয়ায় অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সংঘাতের কারণে প্রবাসীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সুযোগ ব্যাহত হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে।’
তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা ও ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডও ধীর হয়ে পড়েছে। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে চলমান আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানিতে আরো বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে অর্থনীতি বাড়তি চাপে পড়তে পারে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং প্রবাস আয়ের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। সৌদি আরবের মতো একটি দেশ থেকে রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসায় সেখানকার পরিস্থিতির পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে অনেক প্রবাসী আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কোথাও কোথাও স্বাভাবিক চলাচল ও কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। দৈনিক মজুরি বা নির্দিষ্ট সময়ের কাজের ওপর নির্ভরশীল কর্মীদের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। সংঘাত দীর্ঘ হলে কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়তে পারে।’
শ্রমবাজারে সৌদি আরবের প্রভাব : জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ ৩৩ হাজার ৪২৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে এক লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৬ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। অর্থাৎ এ সময়ে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর অর্ধেকের বেশি গেছেন দেশটিতে। দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য সিঙ্গাপুরে গেছেন ৪০ হাজার ৩৯৮ জন।
তবে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সামগ্রিক প্রবণতা ইতিবাচক নয়। আলোচ্য সময়ে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮.৫৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সংঘাতের আগেই বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাপ ছিল। প্রধান শ্রমবাজারে অস্থিরতা সেই সংকট আরো বাড়াতে পারে।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম আগের পাঁচ প্রকল্প ‘অসফল’, আবার নতুন উড়াল সড়ক। প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম নগরীর যানজট নিরসনে গত ১৫ বছরে পাঁচটি প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই এবার অক্সিজেন মোড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ নয়, সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনাই হতে পারে যানজট নিরসনের কার্যকর পথ। নগরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত উড়াল সড়কগুলোর কোথাও সংযোগ সড়ক ও র্যাম্পের ঘাটতি, কোথাও নিচের সড়কে যানজট, আবার কোথাও ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, এসব অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) চালুর সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। তাদের মতে, শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ করে যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা।
এমন পরিস্থিতিতে নগরের উত্তর প্রবেশদ্বার অক্সিজেন মোড়ে নতুন উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিডিএ। গত বছরের জুলাইয়ে প্রকল্পটির নকশা ও বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ শুরু হয়। শিগগিরই অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত উড়াল সড়কটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর একটি র্যাম্প বায়েজিদ থেকে হাটহাজারী সড়কের সঙ্গে এবং অন্যটি কুয়াইশ সড়কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। হাটহাজারী সড়ক থেকে বায়েজিদ ও মুরাদপুরের দিকে দুটি র্যাম্প থাকবে। কুয়াইশ সড়কও সরাসরি বায়েজিদের সঙ্গে যুক্ত হবে। ছয় লেনের কুয়াইশ সড়ককে উড়াল সড়কের সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার।
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন গত সোমবার সমকালকে বলেন, 'অক্সিজেনের উড়াল সড়ক প্রকল্পটি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আমি আশা করি, জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে এটি দ্রুত অনুমোদন পাবে। অনুমোদনের পর কম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করব।'
আগের উড়াল সড়কগুলোর অভিজ্ঞতার পর নতুন প্রকল্পটি কতটা সুফল দেবে, জানতে চাইলে বেলায়েত হোসেন বলেন, 'শহরে ইট-কংক্রিটের জঞ্জাল কম করতে পারলে ভালো। তবে অক্সিজেন মোড়ের উড়াল সড়কটি সময়ের দাবি। এটা থেকে সাত সড়কে সাতটি র্যাম্প নামবে। এতে যান
চলাচল সহজ হবে।'
ইত্তেফাক
‘কমছে সঞ্চয় বাড়ছে ব্যয়, আরো চাপে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, ইউটিলিটি খরচের ক্রমাগত চাপে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। একসময় যেসব পরিবার মাসে বা সপ্তাহে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বাজার-খরচের জন্য আলাদা করে রাখত, তাদের সেই হিসাব এখন মেলানো কঠিন। জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রভাবে গণপরিবহন ও যাতায়াত খরচ বেড়েছে। অফিসের যাতায়াত কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া এখন অতিরিক্ত খরচের খাত।
বাড়তি খরচের হিসাব মিলাতে গিয়ে মানুষ তাদের বিনোদন, ভ্রমণ এবং ভবিষ্যত্ সঞ্চয়ের মতো খাতগুলোতে খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি সমগ্র অর্থনীতির ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানুষের কেনার ক্ষমতা কমে গেলে সামগ্রিক বাজারে চাহিদাও কমে যায়, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দেয়। সরকারি হিসাবেও উঠে এসেছে দেশের সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাওয়ার।
জাতীয় সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে কমছে: টাকার অঙ্কে দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চলতি মূল্যে দেশজ ও জাতীয় উভয় ধরনের সঞ্চয়ের পরিমাণও বেড়েছে। তবে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) অনুপাতে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের হার সেভাবে বাড়েনি, উলটো ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তিন অর্থবছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। অর্থাত্ অর্থনীতির আকার বাড়লেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চয়ের হার বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপিতে বিনিয়োগের হারও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তার বিপরীতে বেড়েছে ভোগ ব্যয়।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯.৯৫ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে সেই হার কমে নেমে এসেছে ২৬.৯৩ শতাংশে। অর্থাত্ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয় প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের চাপ বেড়েছে। ফলে আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ার মানে হলো বিনিয়োগের জন্য মূলধনও কমে যাওয়া। আর বিনিয়োগ কম হলে তার প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। আবার জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে তাতে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সীমানার ভেতর পণ্য ও সেবা খাত থেকে যে পরিমাণ আয় হয়, সেখান থেকে দেশের ভেতরের জনগণ ও সরকারের মোট ভোগ ব্যয়ের অংশ বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা-ই দেশজ সঞ্চয়। আর দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং বিদেশি কোনো খাতের আয় মিলিয়ে হয় জাতীয় সঞ্চয়। বিবিএসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে জিডিপিতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪.২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮.৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
নেতিবাচক প্রভাব বিনিয়োগে :বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে জিডিপিতে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ৩১ শতাংশের ওপরে। বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ সময় বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ উভয়ই কমেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে: পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এই হার ছিল ৮.২৬ শতাংশ। গত মাসের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেল। টানা তিন মাস ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি থাকার পর জুলাই ও আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমেছিল। সেপ্টেম্বরে আবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ল। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খরচের চাপে আছে। ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। ফলে বাজারে শাকসবজি, মাছ ও মাংসের দাম চড়া। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও জাতীয় গড় মজুরি হার কমেছে। সেপ্টেম্বরে জাতীয় গড় মজুরি হার হয়েছে ৭.৯০ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮.০৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে যত মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এর চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে পণ্য কিনতে ভোগান্তি বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আরো চাপে পড়বে মানুষ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১০.৯ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরেও অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জোরালো আভাস নেই। বরং আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ। মঙ্গলবার ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট আউটলুক প্রকাশ করেছে আইএমএফ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়াবে। আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এরই মধ্যে গত ৪ বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে আছে দেশের প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ। অর্থাত্ অর্থনীতির দুর্বলতার চাপ শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা সরাসরি পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তেরপ্রধান শিরোনাম ‘মার্কিন অস্ত্রেও হাউছি হামলা রুখতে পারছে না রিয়াদ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিরক্ষা খাতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জামও কিনেছে দেশটি। তবু ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। খবর সিএনএনের।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে আট হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সামরিক খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান প্রথম দশে। দেশটির হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উন্নত অস্ত্র। কিন্তু এত বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং একাধিক দিক থেকে আসা হামলার হুমকি।
তিন দিক থেকে হামলার ঝুঁকি
সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে ইরান, দক্ষিণ দিক থেকে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহী এবং উত্তর দিক থেকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের সঙ্ঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল। অন্য দিকে ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ড্রোন পাঠিয়েছে। দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে কিংবা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হাউছিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শুধু রাজধানী রিয়াদ বা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলে না। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইন-সহ বিশাল এলাকার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষিত রাখতে হয়। আকাশপথে আসা হামলা শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে তা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্য হাতে থাকে খুব অল্প সময়। সৌদি আরবের একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, হাউছিদের ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে দেশটির প্রতিরক্ষাবাহিনী। তবে কিছু হামলা প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোথায় কিভাবে মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে।
কৌশল বদলেছে হাউছিরা
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হাউছিরা এখন একসাথে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর এই কৌশল অনেকটা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হামলার ধরনের সাথে মিলে যায়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে যায়। ফলে রাডারে এগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া হাউছিরা নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। কোনো একক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। একাধিক দিক থেকে একসাথে হামলা হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বেড়ে যায়। তবে হাউছিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে বাইরের সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আট বছর আগে জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা ইয়েমেনে ইরানি উৎসের ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, সামরিক সরঞ্জাম ও চালকবিহীন আকাশযানের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল।
আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব
হাউছিদের মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। মিসরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। ইরানের সাথে সঙ্ঘাতের শুরুতে সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুদ কমে যাওয়ায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুদ কমিয়ে দিয়েছে এবং নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হাউছিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি, যদিও সেই সম্ভাবনা নাকচও করেননি।
ইসরাইলি সহায়তা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যোগ দেয়ার একটি প্রস্তাব রিয়াদের পক্ষ থেকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। মার্কিন মধ্যস্থতার মাধ্যমে সৌদি আরবের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করা হলেও, দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইসরাইলের এই সহায়তা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেন। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, ইসরাইলের সাথে এই ধরনের সামরিক সহযোগিতা গড়ে উঠলে দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে- এমন রাজনৈতিক আশঙ্কাপ্রসূত হয়েই রিয়াদ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্য একটি কূটনৈতিক সূত্রের মতে, এই সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বরফ গলিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথ সুগম করতে চেয়েছিল তেলআবিব।
বণিক বার্তা
‘জ্বালানি রূপান্তরে ১২০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় একসময় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। তখন ৬৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে অনেক দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং জ্বালানি রূপান্তরে প্রাথমিক ক্ষেত্র হিসেবে সে সময় সৌরবিদ্যুতের এ কর্মসূচিকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হয় আন্তর্জাতিক মহলেও। দেশে-বিদেশে প্রশংসা পেলেও পরবর্তী সময়ে সোলারসহ নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বিস্তৃত করা যায়নি।
জ্বালানি রূপান্তর ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বার বার উদ্যোগ নিয়েও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। যার প্রতিফলন দেখা যায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের করা গ্লোবাল এনার্জি ট্রানজিশন ইনডেক্সেও। জ্বালানি রূপান্তরে বিশ্বের ১২০টি দেশের এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৯তম। এ তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলংকা, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানেরও পেছনে বাংলাদেশ।
চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এনার্জি ট্রানজিশন বা জ্বালানি রূপান্তরে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে উন্নত দেশগুলো। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এ রূপান্তর প্রক্রিয়া অনেক বছর ধরেই বৈশ্বিক পরিসরে আলোচিত। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৭ নম্বর লক্ষ্য ‘সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি রূপান্তরে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ মূলত প্রস্তুতির অভাব। অতীতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু সেটা অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল না। বছরভিত্তিক পরিকল্পনা অর্থাৎ রোডম্যাপ, নীতিমালা, অর্থায়ন, জমি অধিগ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবলসহ নানা সংকট ছিল। আগের চেয়ে এখন জ্বালানি রূপান্তরে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগে তদারকি থাকলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা যেমন পূরণ হবে, তেমনি জ্বালানি রূপান্তরেও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে সরকার।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি খাতের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ ও তুলনা করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও এনার্জি ট্রানজিশন ইনডেক্স (ইটিআই)-২০২৬ প্রকাশ করেছে। ৪৪টি সূচক ব্যবহার করে ১২০টির দেশের বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশগুলোর প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এ ইনডেক্সে কোনো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে তিনটি ক্ষেত্রে—ন্যায্যতা, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা। একটি দেশের ইটিআই স্কোর দুটি উপসূচকের সমন্বয়ে নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতার গুরুত্ব ৬০ শতাংশ এবং জ্বালানি রূপান্তরের প্রস্তুতির গুরুত্ব ৪০ শতাংশ।
ইটিআই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০টি দেশের মধ্যে ৯৯তম। এবারের এ ইনডেক্সে কোনো দেশের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। প্রথমত, সিস্টেম পারফরম্যান্স (এসপি), দ্বিতীয়ত, ট্রানজিশন রেডিনেস (টিআর)।
এসপি স্কোরে মূল্যায়ন হয়েছে বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকারিতা। যেখানে তিনটি বিষয় রয়েছে—জ্বালানির নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী প্রাপ্যতা ও ন্যায্যতা এবং টেকসইতা। এতে মোট স্কোর ১০০। সিস্টেম পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের স্কোর ৬৩ দশমিক ৩।
অন্যদিকে ট্রানজিশন রেডিনেস (টিআর) হচ্ছে ভবিষ্যতে জ্বালানি রূপান্তর এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোন দেশ কতটা প্রস্তুত। সে ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে—নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, উদ্ভাবন এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ। টিআর প্যারামিটারে বাংলাদেশের স্কোর ৩০ দশমিক ৫।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, টিআর প্যারামিটারে বাংলাদেশের স্কোর পিছিয়ে থাকার কারণ মূলত নবায়নযোগ্য খাতে লক্ষ্যমাত্রার ঘোষণা দিয়েও তা পূরণে ব্যর্থতা। এখানে অর্থায়ন, সরকারে জমি অধিগ্রহণ, প্রযুক্তিসহ নানা বিষয় রয়েছে, যেগুলোর প্রস্তুতি অতীতে সঠিকভাবে নেয়া যায়নি।
বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে এনার্জি ট্রানজিশন ইনডেক্সে প্রধান দুটি প্যারামিটার বিবেচনায় নেয়া হয়। বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার কারণ মূলত ট্রানজিশন রেডিনেসে এগোতে না পারা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা। সেটা আর্থিক বা কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ে হতে পারে।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নবায়নযোগ্য খাত এগিয়ে নিতে হলে সরকার যে প্রোগ্রামগুলো নিচ্ছে, তা সময়মতো বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করতে হবে। এ খাতে আগামী দিনগুলোয় প্রস্তুতির একটি বড় জায়গা হলো গ্রিডকে আধুনিকায়ন করা। সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে এখন বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা আগে ছিল না। আগে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে উচ্চ শুল্ক ছিল। এখন তা ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ছয় মাসের জন্য এ শুল্কছাড় দেয়া হয়েছে। তবে এ সময়সীমা আরো বৃদ্ধি প্রয়োজন। এগুলো করা গেলে এনার্জি ট্রানজিশনে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে।’
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘চট্টগ্রামে ফিরছে ভেরিফিকেশন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের পর ওই পরিচয়ে পাসপোর্ট বানাচ্ছেন কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গারা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের সঙ্গে মিলে সক্রিয় একটি চক্র তাঁদের এনআইডি ও পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে শুরু করে চক্রটির বিস্তার কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। তিন বছরে শুধু টেকনাফেই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভুয়া এনআইডি পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের (যাচাই) বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পর সেই সুযোগ নিয়ে চক্রটি মোটা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে, যা উদ্বেগ তৈরি করেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া ঠেকাতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাসপোর্টের আবেদন যাচাইয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন আবার চালুর কথা ভাবছে সরকার। ওই সিদ্ধান্তের আগে কক্সবাজার অঞ্চলে পাসপোর্টের আবেদন যাচাইয়ে বাড়তি সতর্কতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব কথা জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজশে নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গারা এনআইডি সংগ্রহ করতে পারলেও আলাদা পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে পাসপোর্ট পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে পরিপত্র জারি করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকে দেশের নাগরিকদের পাসপোর্ট করতে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগছে না। এই সুযোগটিই নিচ্ছে অসাধু চক্র। জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি সংগ্রহ করা রোহিঙ্গাদের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছে একটি চক্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বহিরাগমন অনুবিভাগ) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভেরিফিকেশন ছাড়া খুব সহজেই সবাই পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন। কিছু রোহিঙ্গার হাতে যেহেতু ইতিমধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি চলে গেছে, তাদের জন্যও পাসপোর্ট পাওয়া সহজ হয়েছে। তাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় আলাদাভাবে পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু করা যায় কি না, তা নিয়ে সরকার চিন্তা করছে।’ তবে জালিয়াতির মাধ্যমে এ পর্যন্ত কতজন রোহিঙ্গা পাসপোর্ট নিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে অপারগতা জানান তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভুয়া বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। শুধু সাবরাং ইউনিয়নেই এর সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব এনআইডি তৈরি করা হয়। এসব এআইডি ব্যবহার করে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট সংগ্রহ করছেন রোহিঙ্গাদের একটি অংশ। ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাঁরা বিভিন্ন দেশে পাড়িও জমাচ্ছেন। তাঁদের অপরাধ প্রবণতার কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অসাধু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে জেলায় অন্তত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশি এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। টেকনাফে ভুয়া এনআইডি তৈরির হার সবচেয়ে বেশি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়ার অভিযোগটি সুষ্ঠু তদন্ত করে জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া এনআইডি বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। এবার যুক্ত হয়েছে পাসপোর্ট। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে এনআইডি মহাপরিচালকের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব এনআইডি আবার যাচাই-বাছাই করে জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া এনআইডিগুলো শনাক্ত ও ব্লক করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন পুনরায় চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ভেরিফিকেশন ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।
সূত্রটি বলেছে, পুলিশ ভেরিফিকেশন পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে পাসপোর্টের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৮ অক্টোবর কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে আবেদন যাচাইয়ে বাড়তি সতর্কতার চিত্র দেখা গেছে। সেখানে আবেদনকারীদের শুধু এনআইডি দেখেই নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। চাকরি বা ব্যবসার তথ্য, স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি, পরিবারের সদস্যদের পরিচয়সহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী পরিচালক মো. শহিদ উল্যাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এখানে কড়াকড়ি থাকায় রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা অন্য জায়গায় গিয়ে পাসপোর্ট করে থাকতে পারেন। কিন্তু এখানে সেই সুযোগ পাননি। এনআইডি থাকলেই যে পাসপোর্ট পাবেন, তা নয়। পুলিশ ভেরিফিকেশন না থাকায় আমরা বিভিন্নভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।’
মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, জালিয়াতির ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় ব্যবহার করা হয়। এতে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যেমন খুলনা অঞ্চলের বাসিন্দা আব্দুল খালেকের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, ছবি–সব ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় আরও কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়। এরপর খালেকের পরিচয়ে রোহিঙ্গা পুরুষের জন্য পাসপোর্টের আবেদন করা হয়। তবে এমন ক্ষেত্রে কেউ কেউ আঙুলের ছাপ দিতে গিয়ে ধরা পড়েন, কেউবা অন্য কোনো পর্যায়ে। আর যাঁরা ধরা পড়েন না, তাঁরা পাসপোর্ট পেয়ে যান।’
দেশ রূপান্তর
‘উচ্চশিক্ষার বারোটা!’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (খুকৃবি) ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে। পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬ কিলোমিটার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ৯০ কিলোমিটার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ১৫৩ কিলোমিটার, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় ১৮০ কিলোমিটার দূরে। এর মধ্যেই গোপালগঞ্জের প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০৯ কিলোমিটার দূরত্বে সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হতে যাচ্ছে।
অর্থাৎ গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫০ থেকে ১৮৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, যার মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাদে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় এই ৪টিতে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভাড়া করা ভবনে পাঠদান চলছে। নতুন করে প্রতিষ্ঠিত শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েরই কার্যক্রমও শুরু হবে ভাড়া করা ভবনে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে সারা দেশের ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টির শিক্ষা কার্যক্রমই চলছে ভাড়া করা ভবনে। কাছাকাছি থাকা এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক, অবকাঠামো, একাডেমিক পরিবেশ ও জনবল কাঠামো নিয়ে সংকটের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতিসহ নানাবিদ অভিযোগও রয়েছে।
১৫ বছরেও পূর্ণতা পায়নি গোবিপ্রবি : ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা গোবিপ্রবি এখনো নানা সংকটে আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৩টি বিভাগের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ২৪২ জন। এর মধ্যে ৩০ জন রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। ফলে অনেক বিভাগেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম। বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৩ বিভাগের জন্য গড়ে দুটির বেশি শ্রেণিকক্ষও নেই। রয়েছে ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার ও আবাসন সুবিধার ঘাটতি। ১০টি বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন বা তার কম। এক যুগের বেশি সময় পার হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
এই বাস্তবতায় কাছাকাছি এলাকায় নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, পূর্বে অনুমোদিত বা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন বছরের পর বছর নানা সংকট আর অনিয়মের মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তখন নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন উচ্চশিক্ষার বারোটা বাজাচ্ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালুর পরিবর্তে ইতিপূর্বে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা অধিগ্রহণ বা ভবন নির্মাণের জন্য যে অর্থ খরচ করা হচ্ছে তা দিয়ে আগে থেকে সংকটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের উন্নয়ন করা যেত।
ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া ২৬টির মধ্যে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। আলাপে বিশ^বিদ্যালয়ের দুর্বলতা হিসেবে শ্রেণিকক্ষ নেই, লাইব্রেরি নেই, ফলে শিক্ষকদের বানানো সিট মুখস্ত করা, শিক্ষক সংকট, অর্থের বিনিময়ে মানহীন শিক্ষক নিয়োগ, অপরিকল্পিত বিভাগ চালু, জনবল নিয়োগের লক্ষ্যে সক্ষমতার বাইরে গিয়ে নতুন নতুন বিভাগ চালুর তোড়জোড় করার মতো বিষয় উঠে আসে। তাদের মতে, এই ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে পার্শ্ববর্তী যেকোনো কলেজে ভালো পাঠদান হয়।
দেশে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে একদিনেই ১০টি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার মান ও প্রয়োজনীয়তার যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান সংকটকে আরও গভীর করছে।
তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী ও যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করার আগেই অবকাঠামো ও জনবল কাঠামো তৈরি হচ্ছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি গৌণ হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘তেল স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি আরব। বিমানবন্দর-সামরিক অবকাঠামোর পর এবার তেল স্থাপনা ও আবাসিক এলাকা হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তর। নতুন করে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আরামকোর তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এতে কেউ হতাহত না হলেও আরামকোর একটি পরিচালনা কেন্দ্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি তেল স্থাপনায় সৌদি সামরিক জোটের হামলার জবাবে দাহরানে সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতি বিদ্রোহীরা। এতে কোম্পানিটির একটি পরিচালনা কেন্দ্রে আগুন ধরে যায় এবং ভবনটির ওপরের তিন তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গতকাল বিবৃতিতে হুতি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, সৌদি আরবের দাহরানে অবস্থিত সৌদি আরামকোর বিভিন্ন ফ্যাসিলিটি, রিয়াদের একটি আরামকো শোধনাগার এবং বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সুনির্দিষ্টভাবে হামলা চালানো হয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগারগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা দাহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। এর ধ্বংসাবশেষ একটি আবাসিক এলাকায় পড়ে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি জোট।
গতকাল বিবৃতিতে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠার মধ্যে আরামকোয় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতের এ হমলায় কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। আরামকোর এক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দাহরানে কোম্পানিটির সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে টাওয়ারটির ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কমপ্লেক্সটিতে আরামকোর একটি বড় পরিচালন কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া গতকাল রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ সময় সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে ‘আকাশপথের হুমকি’সংক্রান্ত জরুরি সতর্কবার্তা পাঠিয়ে নিরাপদে আশ্রয় নিতে বলা হয়। যদিও এর কয়েক মিনিট পরই সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানায়, হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ রিয়াদের একটি আবাসিক এলাকায় পড়ে। এ ঘটনায় চারজন আহত হয়। তাদের মধ্যে দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে। ধ্বংসাবশেষের আঘাতে রাজধানীর ১৫টি বাড়ি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর জবাবে পশ্চিম ইয়েমেনের একাধিক তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুতিদের সামরিক কার্যক্রমে জ্বালানি জোগাতে এবং লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদাব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথকে হুমকির মুখে ফেলতে যেসব সুযোগসুবিধা ব্যবহার করা হচ্ছিল, সেগুলো চিহ্নিত করে এ আক্রমণ চালানো হয়েছে। হামলার পর সেখানকার স্থানীয় তেল কোম্পানিগুলোর কার্যালয়ে ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সানা ও আশপাশ এলাকায় তীব্র জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইনে ভিড় জমাচ্ছে।
এর আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন আল-সাবাহ তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের অভিযোগ, হুতিরা জ্বালানি ডিপো ও প্রশাসনিক ভবনকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। এর জবাবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিতে হামলা চালায় হুতিরা।
এদিকে হুতিদের হামলার জেরে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কয়েক দিন তাঁকে জনসমক্ষেও আসতে দেখা যায়নি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হামলার আশঙ্কায় সৌদি যুবরাজের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তিনি জনসমক্ষে আসা বন্ধ করেছেন এবং তাঁকে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হামলায় প্রশ্নের মুখে সৌদির ভাবমূর্তি: আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরব যে ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রবিবার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত জ্বালানি সম্মেলনে অংশ নেন হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন প্রতিনিধি। এ ছাড়া চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে দেশটিতে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক ইভেন্ট ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এসব হামলা স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি বজায় রাখার ব্যাপারে রিয়াদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সৌদিপ্রবাসী যুক্তরাজ্যের নাগরিক বিলাল বলেন, ‘হামলার ভয়াবহতা ও ধারাবাহিকতা অনেক প্রবাসী পরিবারকে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। আপাতত যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমার পরিবার আর আমি এখানেই একটা জীবন গড়ে তুলেছি। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং হামলা বাড়তে থাকলে অবশ্যই পরিবারকে ফেরত পাঠানোর কথা ভাবব।’
সহযোগীদের খবর
অর্থনীতিতে শুধুই দুঃসংবাদ
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন
১ ঘন্টা আগে
১৫ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ৮ঃ৪৮ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
