বাংলাদেশের শিল্পায়নে সংকট উত্তরণ ও টেকসই বিনিয়োগের পথ

বাংলাদেশের শিল্পায়নে সংকট উত্তরণ ও টেকসই বিনিয়োগের পথ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের শিল্পায়নের সাফল্য সাধারণ মানুষের জীবনে আরও ভালো কাজ, স্থিতিশীল আয় এবং মানসম্মত পণ্যের সুযোগ তৈরি করার কথা। তৈরি পোশাকশিল্প সেই সম্ভাবনার বড় উদাহরণ। কিন্তু জ্বালানির অনিশ্চয়তা, দুর্বল ঋণব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতি এবং অল্প কয়েকটি পণ্যে রপ্তানির কেন্দ্রীভবন এখন শিল্পের অগ্রগতি সীমিত করছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি তার গুণগত মান, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাধীনতার পর কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামো বদলেছে। পোশাকশিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয়, নারীর কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। এখন সেই অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন পণ্য, উন্নত প্রযুক্তি এবং অধিক মূল্য সংযোজনের দিকে যেতে হবে। শিল্পনীতির সাফল্য মাপতে হবে কত কারখানা ঘোষণা করা হলো তার সঙ্গে কতটি চালু হলো, কত স্থায়ী কাজ তৈরি হলো এবং উৎপাদন কতটা প্রতিযোগিতামূলক হলো, সেই হিসাব দিয়ে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সংকট ও সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, জুন ২০২৬-এ খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩.২ শতাংশ হয়েছে, যা ডিসেম্বর ২০২৫-এ ছিল ৩০.৬ শতাংশ। একই মূল্যায়নে আগের বছরের তুলনায় আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পড়ার কথা এসেছে। এগুলো দেখায়, শিল্পের অর্থায়ন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

রপ্তানিতে অবশ্য সাম্প্রতিক উন্নতি রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে বাসসের ১ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে পণ্য রপ্তানি ৬.৩৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৩.০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক প্রায় ১০.৫৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোটের প্রায় ৮০.৮ শতাংশ। পোশাকের প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেও অন্য খাতে রপ্তানি বাড়ানো প্রয়োজন; এক খাতের ধাক্কায় পুরো অর্থনীতি যাতে বিপর্যস্ত না হয়। একই প্রান্তিকে ওষুধ রপ্তানি ৪০.৩৯ শতাংশ, পাট ও পাটপণ্য ৩১.৫৫ শতাংশ, হালকা প্রকৌশল ১৬.৫১ শতাংশ এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ১৪.৭৪ শতাংশ বেড়েছে। কৃষিপণ্য এবং হিমায়িত ও জীবিত মাছের রপ্তানি কমেছে। এই স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ী সাফল্য ধরে নেওয়া যাবে না; তবে কোন খাতে মানোন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ ও সরবরাহব্যবস্থায় সহায়তা দিলে ফল পাওয়া যেতে পারে, তার নির্দেশনা মেলে।
বিদেশি বিনিয়োগেও গুণগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপভিত্তিক বিডার ১৪ মে ২০২৬-এর তথ্যে, ২০২৫ সালে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-এর তুলনায় ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু ইকুইটি মূলধন বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে। তাই মোট প্রবাহের বৃদ্ধি মানেই সমান হারে নতুন কারখানা কিংবা নতুন বিদেশি উদ্যোক্তার আগমন নয়। শিল্পের জন্য জ্বালানিও একটি বড় বাধা। পেট্রোবাংলার তথ্য উদ্ধৃত করে ইউএনবির ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬১৯ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে আনুমানিক চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। নির্দিষ্ট দিনের এই হিসাবে ঘাটতি প্রায় ৩১-৩৫ শতাংশ। গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুতের সরবরাহ অনিশ্চিত হলে যন্ত্রপাতি অলস থাকে, উৎপাদনের সময় বাড়ে এবং সময়মতো ক্রয়াদেশ সরবরাহ কঠিন হয়।

বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি ও বাজার যুক্ত করা
এসব সংকট মোকাবিলায় বিদেশি বিনিয়োগ সহযোগিতা বা এফআইসি মডেল গ্রহণ করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য হবে বিদেশি মূলধনের সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ আনা। স্থানীয় উদ্যোক্তাকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী বা যৌথ উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা না বাড়লে বিনিয়োগের সুফল একটি কারখানার সীমানায় আটকে যেতে পারে।

বিনিয়োগের চুক্তি ও প্রণোদনার শর্তে স্থানীয় কর্মীর প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার, মানসম্মত স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি এবং গবেষণা সহযোগিতার নির্দিষ্ট অঙ্গীকার রাখা যায়। তবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত বাস্তবসম্মত হতে হবে এবং মেধাস্বত্ব ও প্রযোজ্য বাণিজ্যবিধি মানতে হবে। কাগজে প্রশিক্ষণের সংখ্যা দেখিয়ে সুবিধা নেওয়া ঠেকাতে দক্ষতার পরীক্ষা, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ এবং চাকরিতে টিকে থাকার ফল যাচাই প্রয়োজন। দীর্ঘ করছুটির বদলে ফলভিত্তিক সহায়তা অধিক কার্যকর হতে পারে। যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন, মান সনদ অর্জন, প্রশিক্ষণ কিংবা শক্তি সাশ্রয়ে যাচাইযোগ্য অগ্রগতি হলে সহায়তার পরবর্তী কিস্তি দেওয়া যেতে পারে। প্রণোদনার মেয়াদ, সর্বোচ্চ সীমা ও সরকারের রাজস্বব্যয় প্রকাশ করতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীর জন্য নিয়ম পরিষ্কার থাকবে এবং সরকারি অর্থের সুফল মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

জেলা শিল্পায়নে স্থানীয় সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার
ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্পের বাইরে জেলা পর্যায়ে উৎপাদনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। দশ বছরে ৬৪ জেলায় গড়ে ৬৮টি করে মোট ৪ হাজার ৩৫২টি শিল্প ইউনিট গড়ে তোলার লক্ষ্য বিবেচনা করা যায়। এটি একটি প্রস্তাবিত পরিকল্পনা-লক্ষ্য; নিশ্চিত বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানের পূর্বাভাস নয়। সব জেলায় একই সংখ্যা চাপিয়ে দেওয়ার বদলে কাঁচামাল, বাজার, শ্রমদক্ষতা, পরিবহন ও পরিবেশগত ধারণক্ষমতা অনুযায়ী প্রকল্প নির্বাচন করা উচিত। প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত কয়েকটি জেলায় বিদ্যমান শিল্পগুচ্ছের উন্নয়ন দিয়ে শুরু করা যায়। কৃষিপ্রধান এলাকায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হিমাগার, পাটপ্রধান এলাকায় বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য এবং প্রকৌশলদক্ষতা আছে এমন এলাকায় যন্ত্রাংশ উৎপাদন অগ্রাধিকার পেতে পারে। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও উন্নত বস্ত্রেও সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে। কোনো খাতে চাহিদা ও প্রতিযোগিতা পরীক্ষা ছাড়া শুধু জমি বরাদ্দ দিয়ে শিল্পায়ন সফল করা কঠিন।

প্রতিটি শিল্পগুচ্ছে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য পরিশোধন, পরীক্ষাগার ও দক্ষ পরিবহন। এসব যৌথ সুবিধা ছোট কারখানার খরচ কমাতে পারে। শ্রমিকের নিরাপদ আবাসন, যাতায়াত ও শিশুযত্নের ব্যবস্থা থাকলে নারীর অংশগ্রহণও সহজ হয়। কৃষিজমি ও জলাভূমির ক্ষতি কমিয়ে জমি ব্যবহার এবং বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বিবেচনা করে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।

ঋণ ও বন্ধ কারখানায় শৃঙ্খলা ফেরানো
খেলাপি ঋণের উচ্চ অনুপাত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তার অর্থপ্রাপ্তি কঠিন করে তোলে। ব্যাংক সংস্কারে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর সম্পদমান যাচাই জরুরি। সক্ষম প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনর্গঠন নগদ প্রবাহ ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভিত্তিতে হতে হবে। দায়বদ্ধতা ছাড়া বারবার পুনঃতফসিল করলে দুর্বল ঋণের সমস্যা থেকে যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে শুধু জমির জামানতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্রয়াদেশ, চালান ও যাচাইযোগ্য নগদ প্রবাহভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানো যেতে পারে। আংশিক ঋণ নিশ্চয়তায় ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি বহাল রাখতে হবে, যাতে ঋণ যাচাইয়ের আগ্রহ থাকে। সরবরাহকারীর বিল সময়মতো পরিশোধ ও বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ছোট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধনের চাপ কমাবে। উপযুক্ত ক্ষেত্রে সম্পদভিত্তিক ইজারা ও মুশারাকা অর্থায়নও বিবেচ্য। বন্ধ শিল্পের ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হবে হালনাগাদ সম্পদতালিকা। বন্ধ ইউনিটের সংখ্যা ও অবস্থা যাচাই করে প্রতিটির জমির মালিকানা, ঋণ, শ্রমিকের পাওনা, যন্ত্রপাতি ও পরিবেশগত দায় নির্ণয় করতে হবে। কোনটি পুনরায় চালু করা সম্ভব, কোনটি একীভূত করা উচিত এবং কোনটির জমি বা স্থাপনা অন্য উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য, তা স্বাধীন মূল্যায়নে নির্ধারণ করা দরকার। পুনরুজ্জীবনের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগকারী নির্বাচন এবং স্বাধীন মূল্য নির্ধারণ প্রয়োজন। শ্রমিকের পাওনা ও পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চুক্তিতে রাখতে হবে। পুরোনো অবকাঠামো কাজে লাগালে নতুন জমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণের খরচ কমতে পারে। তবে অকার্যকর ব্যবসাকে অনির্দিষ্ট ভর্তুকিতে টিকিয়ে রাখা পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়।

​দক্ষতা ও প্রযুক্তিতে প্রয়োগভিত্তিক অগ্রগতি

প্রতিটি শিল্পগুচ্ছের সঙ্গে পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অংশীদারত্ব করা যায়। প্রতিষ্ঠান জানাবে কী দক্ষতা দরকার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র সে অনুযায়ী পাঠ্যক্রম ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচি সাজাবে। প্রশিক্ষণের ছয় মাস পর কতজন কাজ পেয়েছেন, আয় কতটা বদলেছে এবং নিয়োগদাতা তাঁদের কাজে সন্তুষ্ট কি না, তা মাপতে হবে। নারী ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের তরুণদের অংশগ্রহণের বাধাও দূর করতে হবে। সব কারখানায় একসঙ্গে ব্যয়বহুল রোবট বসানোর প্রয়োজন নেই। প্রথমে ডিজিটাল মজুত হিসাব, উৎপাদন পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ চালু করা যেতে পারে। পর্যাপ্ত তথ্য ও দক্ষতা তৈরি হলে সেন্সরভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ত্রুটি পূর্বানুমান যুক্ত করা যায়। ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য যৌথ প্রযুক্তিসেবা কেন্দ্র বিনিয়োগের খরচ ভাগ করে দিতে পারে। প্রযুক্তিতে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কর্মীর কাজ বদলায়। তাই সহায়তার একটি অংশ কর্মীদের পুনঃদক্ষতায় ব্যয় করতে হবে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পে যন্ত্র বন্ধ থাকার সময়, নষ্ট পণ্যের হার ও শ্রমঘন্টাপ্রতি উৎপাদন মেপে প্রযুক্তির সুফল নির্ণয় করা উচিত। ভিত্তিতথ্য ছাড়া সবার জন্য ২৫-৪০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিশ্বাসযোগ্য হবে না।

সবুজ শিল্পে ব্যয় সাশ্রয় ও বাজার প্রস্তুতি
শিল্পের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, দক্ষ মোটর ও বয়লার, বর্জ্যতাপ পুনর্ব্যবহার এবং পানি পুনঃব্যবহার একই পরিকল্পনায় আনতে হবে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার স্বচ্ছ চুক্তি ও গ্রিড ব্যবহারের স্পষ্ট নিয়ম বড় শিল্পকে পরিচ্ছন্ন শক্তির সুযোগ দিতে পারে। সৌরবিদ্যুতের পরিবর্তনশীল উৎপাদনের সঙ্গে ব্যাকআপ ও গ্রিডের ভারসাম্য বিবেচনা করা জরুরি। এতে জ্বালানি খরচ ও আমদানির ঝুঁকি কমানোর বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়।

পরিবেশবান্ধব শিল্পগুচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারযোগ্য অবশিষ্ট উপকরণ অন্যটির কাঁচামাল হতে পারে। তবে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের আগে তার নিরাপত্তা ও বাজার যাচাই করতে হবে। বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচালনা ও পরীক্ষার অর্থ সংস্থান প্রয়োজন। পানি ও শক্তির ব্যবহার প্রতি একক পণ্যে কতটা কমছে, সেই তথ্য প্রকাশ করলে পরিবেশগত সুফল ও উৎপাদন ব্যয়ের সম্পর্ক বোঝা যাবে।

এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি অব্যাহত রাখতে হবে। জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্যে নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬; বাংলাদেশ প্রস্তুিিতকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে। আবেদন বা সুপারিশকে চূড়ান্ত অনুমোদন ধরে নেওয়া যাবে না। বাজারভেদে পরিবর্তন ও অন্তর্র্বতী সুবিধা আলাদা, তাই একই দিনে সব শুল্কসুবিধা শেষ হবে এমন ধারণাও সঠিক নয়। পণ্যভিত্তিক শুল্ক, উৎসবিধি ও মানের শর্ত বিশ্লেষণ করে উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। ইউরোপের বর্তমান কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন পণ্য রয়েছে; তৈরি পোশাক নেই। তাই পোশাকের ওপর নির্দিষ্ট কার্বন কর আরোপকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বলা ঠিক হবে না। তবে ক্রেতার পরিবেশগত শর্ত, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতের বিধি মোকাবিলায় উৎপাদনের নির্গমন ও সম্পদ ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য হিসাব রাখা প্রয়োজন।

বাস্তবায়নে সময়সীমা ও জবাবদিহি
প্রথম ছয় মাস: শিল্পের জ্বালানি, ঋণ ও অনুমোদনের বাধা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার তালিকা করতে হবে। একই সময়ে বন্ধ শিল্পের সম্পদতালিকা, সম্ভাবনাময় শিল্পগুচ্ছের সমীক্ষা এবং বিনিয়োগকারীর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শুরু করা যায়। একক সেবাব্যবস্থায় আবেদন কোন সংস্থায় কত দিন আটকে আছে, তা দৃশ্যমান করা জরুরি। দ্রুত অনুমোদনের নামে শ্রম ও পরিবেশ সুরক্ষা দুর্বল করা যাবে না।

পরবর্তী আঠারো মাস: নির্বাচিত শিল্পগুচ্ছে যৌথ পরীক্ষাগার, দক্ষতা কর্মসূচি, সৌরবিদ্যুৎ ও ক্ষুদ্র শিল্পের অর্থায়ন পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে অবকাঠামো নির্মাণ হলে ব্যবহারমূল্য, ঝুঁকি বণ্টন ও সরকারের ভবিষ্যৎ দায় প্রকাশ করতে হবে। সবুজ বন্ড বা সুকুকে অর্থের ব্যবহার এবং পরিবেশগত ফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তিন থেকে পাঁচ বছর: সফল উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা যাবে। অগ্রগতি মাপতে চালু কারখানার সংখ্যা, স্থায়ী চাকরি, নারীর অংশগ্রহণ, পোশাকবহির্ভূত রপ্তানি, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, ঋণ ফেরত এবং প্রতি একক পণ্যে শক্তি ও পানির ব্যবহার প্রকাশ করতে হবে। ব্যর্থ প্রকল্পে সহায়তা সংশোধন বা বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

লেখক: ফিন্যান্স ও বিনিয়োগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব