আজারবাইজানে হিজাব পরলেই স্কুলের দরজা বন্ধ, দেশজুড়ে তোলপাড়

আজারবাইজানে হিজাব পরলেই স্কুলের দরজা বন্ধ, দেশজুড়ে তোলপাড়

ফন্ট সাইজ:

আজারবাইজানে সরকারি স্কুলে হিজাব পরা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন পোশাকবিধির কারণে হিজাব পরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিক্ষোভ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এমনকি দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গেও এ ইস্যুতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

দেশটির বাকুর একটি স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক গুলশান আলিয়েভার কাছে হিজাব নিয়ে বিতর্ক এখন ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ২৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই শিক্ষক জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে মাথায় হিজাব পরে স্কুলে গেলে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। একইভাবে স্কুলে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়েছে তার মেয়েকেও।
আলিয়েভা বলেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে চাই, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে চাই এবং ধর্মীয় বিশ্বাস যেন আমার চাকরির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করে পেশাগত জীবন চালিয়ে যেতে চাই।’

আলিয়েভা আরও বলেন, ‘কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করা ও শিক্ষা গ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’ প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। স্কুলে যাওয়া অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই শিক্ষক।

নতুন পোশাকবিধি ঘিরে বিক্ষোভ, আটক ৩৭
গত মাসে আজারবাইজানে স্কুলের পোশাকবিধি নিয়ে নতুন নিয়ম চালু করা হয়। এতে সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়নি। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থি—এমন পোশাক পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধির প্রয়োগ ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত।

৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ আজারবাইজানে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। হিজাব পরার কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। সোমবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন বিধি ভঙ্গের পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
বাকু নগর শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, স্কুলগুলো নতুন পোশাকবিধি মেনে চলছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

হিজাব ধর্মীয় দায়িত্ব, বললেন প্রধান মুফতি
আজারবাইজানের ককেশাস মুসলিম বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদে মঙ্গলবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, হিজাব একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব’। তবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা না গেলেও নাগরিক হিসেবে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে স্কুলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করেন তিনি।

তার অভিযোগ, বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হচ্ছে। সমালোচকদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।

তবে সবাই মনে করেন না যে নতুন বিধি ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন। বাকুর বাসিন্দা তিমুর রাজায়েভের মতে, হিজাব নিয়ে বিতর্ককে রাজনৈতিক রূপ দেয়া হয়েছে। তার বক্তব্য, সরকারের নির্ধারিত পোশাকবিধি নিয়ে বিতর্ক না করে তা মেনে চলা উচিত।
তিনি বলেন, ‘ইউনিফর্ম বা নির্ধারিত পোশাকবিধি বাস্তবায়নে সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে।’
১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের হিজাব পরারও বিরোধিতা করেন রাজায়েভ। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিশুদের নিজেদের ইচ্ছার পরিবর্তে তাদের অভিভাবকদের পছন্দের প্রতিফলন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মীয় মানুষের অধিকারকে সম্মান করা হয়।’

সমঝোতার আহ্বান বিরোধী নেতার
বিরোধী দল রিয়েল পার্টির প্রধান নাতিগ জাফারলি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের হিজাব পরার বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘ছাত্রীদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা দরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারি স্কুলগুলোকে সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
শিক্ষকদের পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপেরও বিরোধিতা করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘শিক্ষকরা প্রাপ্তবয়স্ক। তারা কী পোশাক পরবেন, তা নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা ভুল পদ্ধতি।’

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কে উত্তেজনা
হিজাব বিতর্ক এবার আজারবাইজানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গেও সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিশ্বাসের কারণে মাথা ঢেকে রাখা একজন শিক্ষার্থীকে স্কুলের দরজায় আটকে রাখা—এটি কীভাবে বিবেক বা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারে?’

এর জবাবে আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন ইয়েনি আজারবাইজান পার্টি (ওয়াইএপি) মঙ্গলবার সারালের মন্তব্যের সমালোচনা করেছে। দলটি বলেছে, তার ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ মন্তব্য দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
আজারবাইজানের পার্লামেন্টের মানবাধিকার কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ ওরুজ অবশ্য নতুন বিধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি, এটি ধর্মীয় বৈষম্য নয়, কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাতও নয়।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘স্কুলের বাইরে মাথায় স্কার্ফ পরার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে সবার জন্য অভিন্ন নিয়ম বজায় রাখাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।’
তিনি আরও বলেন, আজারবাইজানের অনেক মানুষ হিজাব পরেন না, কিন্তু কোরআনকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানেন এবং সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন। তাই স্কুলের পোশাকবিধি নিয়ে মতপার্থক্যকে ধর্মের প্রতি শত্রুতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। দেশটির জাতীয় এনজিও ফোরামও বিতর্কটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সমালোচনা করেছে।