শাহজালালে আটকা ১৩ হাজার যাত্রী

শাহজালালে আটকা ১৩ হাজার যাত্রী

ফন্ট সাইজ:

হঠাৎ করেই বদলে গেছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চিরচেনা দৃশ্য। ৮২টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর কমে গেছে সৌদিগামী যাত্রী ও তাদের স্বজনদের জটলা। কারণ এতে আটকা পড়েছেন প্রায় ১৩ হাজারের বেশি যাত্রী। তাই শাহজালালে সৌদি ফেরত যাত্রী-স্বজনদের আনাগোনা নেই। অথচ ক’দিন আগেও সৌদিগামী ও সৌদি ফেরত যাত্রী-স্বজনদের আনাগোনায় সরব থাকতো টার্মিনাল এলাকা। কিন্তু সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর একের পর এক ফ্লাইট হচ্ছে। ঢাকা থেকে যাত্রীরা যেমন যেতে পারছেন না ঠিক তেমনি কোনো যাত্রী আসতে পারছেন না। দুই দেশে আটকা পড়া যাত্রীদের অধিকাংশই ওমরাহ যাত্রী। আর আরেকটি বড় অংশ প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। প্রতিদিন শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে সৌদির বিভিন্ন গন্তব্যে যে ক’টি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা করে তার সবক’টিই যাত্রীতে পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু গত ক’দিনে একের পর এক ফ্লাইট বাতিলের কারণে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। যাত্রীদের যাওয়া-আসায় ভাটা পড়েছে। এসব যাত্রী কবে যেতে পারবেন তার ঠিক নাই। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে অনেকেই চাকরি হারানোর শঙ্কায় পড়বেন। বিশেষ করে শ্রমিক হিসেবে যারা জমি স্বর্ণালংকার বিক্রি ও ঋণ করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা হতাশার মধ্যদিয়ে সময় পার করছেন।

সিভিল এভিয়েশন অথরিটি জানিয়েছে, হুতিদের হামলার পর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ৮২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে আটকা পড়েছেন প্রায় ১৩ হাজার ৭১ জন সৌদিগামী যাত্রী। রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পর এসব যাত্রী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বলছে, বাতিল হওয়া ৮২ ফ্লাইটের মধ্যে ডিরেক্ট ফ্লাইট ৩২টি আর ট্রানজিট ফ্লাইট ৫০টি। বাতিল হওয়া ডিরেক্ট ফ্লাইটের মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের ১০, ইউএস বাংলার ১০, সৌদি এয়ারলাইন্সের ৫ ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭। আর ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ২২, সালাম এয়ারের ৪, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ১১, ইজিপ্ট এয়ারের ১, কাতার এয়ারওয়েজের ৬ ও ফ্লাই দুবাইয়ের ৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত আর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৭ই অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ধরনের ফ্লাইট বাতিল করেছে। পর্যায়ক্রমে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়ছেই।

সরজমিন যা দেখা গেল: মঙ্গলবার শাহজালালে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক ফ্লাইট বাতিলের খবরে সৌদিগামী যাত্রীরা এখন আর বিমানবন্দরে আসছেন না। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট সৌদিতে যায়। যাত্রীরা না আসার কারণে বিমানবন্দরের টার্মিনালের সামনে চিরচেনা যাত্রী ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়নি। একাধিক নিরাপত্তাকর্মী জানিয়েছেন, ফ্লাইট বাতিলের তথ্য যাত্রীরা জেনে গেছেন। তাই ঢাকায় এসে আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন না। তারা ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। আর সৌদির যাত্রী ও তাদের স্বজনরা না আসাতে বিমানবন্দরে চাপ একেবারে কম। ফেনীর বাসিন্দা মোহাম্মদ রাব্বির বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মঙ্গলবার দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল। বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে। তার ভিসার মেয়াদ রয়েছে আগামী ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত। এরমধ্যে সৌদি আরবে যেতে না পারলে দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। রাব্বি বলেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন তিনি। একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন ফেনী থেকে আসা শুক্কুর মিয়া। সকাল ৭টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল দাম্মাম গিয়ে কাজে যোগ দেয়া। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার চাকরিও।

নাসির উদ্দীন নামের এক যাত্রী বলেন, বিমানবন্দরের এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি। আগে যাত্রী ও স্বজনদের ভিড় ঠেলে লাইনে দাঁড়াতে হতো। কিন্তু আজ বিমানবন্দর প্রায় ফাঁকা। সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের উপস্থিতি কম। হাবিবুর রহমান বলেন, এখন যাত্রীর উপস্থিতি খুবই কম। সৌদি আরবে বাংলাদেশের অনেক মানুষ থাকেন। ফ্লাইট বাতিলের কারণে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। নয়ন নামের এক যাত্রী বলেন, বিমানবন্দরে চিরচেনা দৃশ্য নেই। সাধারণত পুরো টার্মিনাল যাত্রীদের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। যাত্রীরা যেতে পারছেন না, বিষয়টি তার খারাপ লাগছে।

এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবে চলমান বিমানবন্দরে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা থেকে দাম্মামগামী এবং ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট আগামী ১৭ই অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ওই ফ্লাইটগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও যাত্রার সময়সূচি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যথাসময়ে জানানো হবে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীগণ জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত এবং বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে টিকিট ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য নিকটস্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে।

তবে, সৌদি আরবের যেকোনো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সোমবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সব এয়ারলাইন্সকে সতর্কতাসহ বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি জানান, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইন্সকে অবিলম্বে নির্দেশনাগুলো কার্যকর করতে হবে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ফ্লাইটের বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, এয়ারলাইন্সের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে জানাতে হবে। পাশাপাশি ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, পরিবর্তিত যাত্রার সময়, পুনরায় বুকিং, টিকিটের অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সকে যাত্রীদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং অন্যান্য উপযুক্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করতে বলা হয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থানরত কিংবা পরিস্থিতি সম্পর্কে না জানার কারণে সেখানে আসা ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বসার ব্যবস্থা, পানীয় জল, নাশতা, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্নের বিষয়ে সমন্বয়ের জন্য প্রতিটি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সকে অবিলম্বে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে। ওই কর্মকর্তার নাম, পদবি, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা দ্রুত বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট বিভাগকে জানাতে হবে। পরিস্থিতি চলাকালে তাকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না। প্রত্যেক যাত্রীর সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সৌদি আরবে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছে সরকার। তবে সৌদি আরবও সংকটের মধ্যে থাকায় এ আলোচনা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে। বলেন, যেসব প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তাদের কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ করে দিতে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। অতীতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করেছে। এবারো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।