তিনি পাবলিক পেশকার

তিনি পাবলিক পেশকার

ফন্ট সাইজ:

সরকারি ভাবেই ইউএনও অফিসের একজন অফিস সহকারীকে মোবাইল কোর্টের পেশকারের দায়িত্ব দেয়া আছে। কিন্তু সেখানে বাইরের লোক দিয়ে করানো হচ্ছে পেশকারির কাজ। শুধু তাই নয়, উপজেলা প্রশাসনের আরও অনেক কাজেই মাতুব্বরি করে বেড়াচ্ছে বহিরাগত ওই পেশকার। অবলীলায় সরকারি দপ্তরের অফিস সহকারীর চেয়ারে 
বসে কাজ করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া প্রশাসন দাপিয়ে বেড়ানো এই পাবলিক পেশকারের নাম আমজাদ হোসেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই মাজারের কর্মচারী আমজাদের রাজত্ব গড়ে উঠে প্রশাসনে। এ সময়ে দায়িত্ব পালনকারী ইউএনওদের রহস্যজনক আনুকূল্য পেয়ে ভাগ্যের চাকাও ঘুরতে শুরু করে তার। ইউএনও’র বাংলো-অফিস সবখানে, দিনরাতে বিচরণ এই আমজাদের। ফলে ইউএনও’র অধীনস্থ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তারাও তাকে সমঝে চলেন। অবশ্য আমজাদকে নিয়ে চাপা অসন্তোষ উপজেলার প্রায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে। আমজাদের বাড়ি সীমান্তবর্তী রাজেন্দ্রপুর গ্রামে। তার পিতার নাম আবদুল আলী।

২০২৪ সালের ৩০শে জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে এখানে যোগ দেন গাজালা পারভীন রুহি। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে ইউএনও’র সার্বক্ষণিক সহচর হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন উপজেলার মানুষ তাকে। এরপর ২০২৫ সালের ১৯শে আগস্ট ইউএনও হয়ে আসেন অতীশ দর্শী চাকমা। তার সময়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন আমজাদ। উপজেলা পুকুর বন্দোবস্ত থাকা সত্ত্বেও ইউএনও অতীশের নির্দেশে ইজারাদারের লাখ লাখ টাকার মাছ ধরে নিয়ে যান আমজাদ ও প্রশাসনে থাকা তার আরও কয়েকজন সহযোগী। বর্তমান ইউএনও তাপসী রাবেয়া যোগ দেন ২০২৫ সালের নভেম্বরে। তার সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের পেশকারি পান আমজাদ। লিপ্ত হন আরও নানা অপকর্মে।

উপজেলা প্রশাসনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অফিস সহকারী মো. বদরুজ্জামানকে ডিসি অফিস থেকে অফিসিয়ালি মোবাইল কোর্টের পেশকারের দায়িত্ব দেয়া আছে। কিন্তু তাকে কখনো মোবাইল কোর্টে নেয়া হয় না। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর তথ্য দিয়ে তাকে ডিসি অফিসে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিতে বলা হয়। বদরুজ্জামানের পরিবর্তে ইউএনও’র ইচ্ছানুসারে মোবাইল কোর্টের পেশকারের দায়িত্ব পালন করছে আমজাদ। ডিসি অফিস থেকে দেয়া পেশকারের কাজের বিলও নিচ্ছেন।

সরজমিনে তথ্য মিলে ইউএনও সভাপতি এমন দু’টি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী পদে চাকরি করছেন আমজাদ। ২০১৭ সালে খড়মপুর কেল্লা শহীদ মাজারের অফিস সহকারী হিসেবে নিয়োগ হয় তার। ইউএনও শামছুজ্জামান তাকে এই চাকরি দেন। ইউএনও মাজার কমিটির সহ-সভাপতি এবং ডিসি সভাপতি হওয়ায় আমজাদের তখন থেকে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এছাড়াও আমজাদকে শিল্পকলা একাডেমির অফিস সহকারীর চাকরিও দেয়া হয়েছে। এখানে নিয়োগ হয় তার ২০১৫ সালে। মাজার থেকে বেতন পান ২১ হাজার টাকা। আর শিল্পকলা থেকে সম্মানী মিলে হাজার তিনেক টাকা। শুধু দু’জায়গাতে চাকুরী নয়, অভিযোগ রয়েছে পুরো উপজেলা প্রশাসন এবং ই্‌উএনও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকায় পৌর প্রশাসনেও আধিপত্য করছে সে। মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খাদেম মিন্টু জানান, আমজাদ ৭/৮ বছর ধরে মাজারে আছে। আমাদেরতো সারাদিন কাজ থাকে না। সকাল ৯ টায় এলে ১২ টায় চলে যায়। প্রয়োজন অনুপাতে কাজ। আমাদের বিভিন্ন ফাইল আছে। সেই হিসেবে ইউএনও অফিসে তার আসা-যাওয়া আছে। মাজার থেকে ২১ হাজার টাকা বেতন দেয়া হয় বলেও জানান- তিনি। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক, বিআরডিবি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম জানান, শিল্পকলার জন্মলগ্ন থেকে আমজাদ অফিস সহকারী হিসেবে আছেন। এটার সভাপতি ইউএনও স্যার। তিনিই এই নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি জানান- এখান থেকে সম্মানী দেয়া হয় ৩ হাজার টাকা। ও-ই সব কাজ করে। শুক্র ও শনিবার, দু’দিন ক্লাস হয়। এছাড়াও কোনো কাজ থাকলে করে।

জমি থেকে মাটিকাটা, ড্রেজার চালিয়ে বালু ভরাট, ভূমি অফিসের কাজকর্মে আমজাদের সঙ্গে কথা বললেই মিলে সুফল। স্থানীয়রা জানান- জ্বালানি তেলের সংকটের সময়েও তেল ব্যবসায়ীদের তার কাছে ধরনা দিতে দেখা গেছে। উপজেলা কমপ্লেক্স অভ্যন্তরে ইজারায় থাকা মসজিদের পুকুরের মাছ জোর করে ধরে নেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
ইউএনও অফিসের সামনেই কথা হয় স্থানীয় কলেজ পাড়ার এক বাসিন্দার সঙ্গে। নামপ্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আমি বুঝিনা, তার কথাই সব ইউএনও’ শোনেন। সে রেভিনিউভুক্ত কোনো কর্মচারী বা স্টাফ নয়। সারাক্ষণ দেখি ইউএনও স্যারদের সঙ্গে হাঁটে। সে পরিষদের কোনো লোক না হয়েও সারাক্ষণ দেখি ইউএনও অফিসে থাকে। ইউএনও স্যারের লগে থাকে, গাড়িতে থাকে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আমজাদ হোসেন বলেন, মাজারেরটা হলো তার প্রাইভেট জব। আর উপজেলারটা পার্টটাইম করি। মাজারের ফাইলগুলো ইউএনও সাহেবের মাধ্যম হয়ে ডিসি অফিসে নিয়ে যাই। এক্ষেত্রে পয়পরিচয়তো স্বাভাবিকভাবেই থাকতে পারে। অন্যগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলা হয়, সম্পূর্র্ণ মিথ্যা। আমি সাধারণ ব্যক্তি। যতটুকু পারি মানুষের জন্য কাজ করি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের পেশকারি করার অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ওটা স্যারের পেশকার আছে। ওরা দেখে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া বলেন, মাজারের সহ-সভাপতি আমি। সভাপতি ডিসি স্যার। তাহলে সে আমাদের সঙ্গে চাকরি করবে না। আমাদের সঙ্গেইতো তার কাজ। মাজারের অফিসিয়াল পার্টটাতো সে আমাদের সঙ্গেই করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে আমজাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বলেন, সার্বক্ষণিক স্টাফ বলতে তো কেউ এখানে থাকে না। আদালত পরিচালনার সময় কখনো প্রয়োজন হলে সে থাকে।