একসঙ্গে তিন দেশ সফরে বের হচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সফরের তালিকায় রয়েছে আজারবাইজান, ইরাক ও উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া। জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার, এশিয়ায় আঞ্চলিক আস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে বহুপক্ষীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে
ধরাই এসব সফরের মূল উদ্দেশ্য। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যমতে, হুমায়ুন কবির আজ ঢাকা ছাড়বেন।
সফরের প্রথম গন্তব্য আজারবাইজানের রাজধানী বাকু। সেখানে ১৫ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা প্রতিষ্ঠাবিষয়ক সম্মেলনের সপ্তম শীর্ষ সম্মেলন (সিআইসিএ)। এরপর ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ১৭ ও ১৮ই অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ৫২তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেয়ার কথা রয়েছে তার। দুই সম্মেলনেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।
সফরের শেষ পর্বে আলজেরিয়ায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির সম্ভাবনা এবং সারসহ অন্যান্য খাতে সহযোগিতা সমপ্রসারণের প্রেক্ষাপটে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় আলজেরিয়ার দিকে নজর ঢাকার: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের ফলে দেশের গ্যাস সরবরাহ ও আমদানি ব্যয় নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রচলিত সরবরাহকারীদের পাশাপাশি নতুন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে ঢাকা।
গত জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতার এনার্জি ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা জানিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য ঘাটতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনা এবং অন্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তির বিকল্প খতিয়ে দেখছিল বাংলাদেশ। গত বছর বাংলাদেশে আমদানি করা প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজি’র মধ্যে কাতার থেকে এসেছিল প্রায় ৪১ লাখ ৫০ হাজার টন। এলএনজি’র উচ্চমূল্য বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতেও চাপ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া বাংলাদেশের জন্য বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনায় এসেছে। দেশটির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থাকায় সেখান থেকে জ্বালানি পরিবহনে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করতে হয় না। আলজেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বাজারে এলএনজি ও এলপিজি রপ্তানি করে আসছে। বাংলাদেশের জন্য দেশটি থেকে জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গতকাল ঢাকায় নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদুল ওয়াহাব সাইদানির সঙ্গে বৈঠক করেন হুমায়ুন কবির। সেখানে জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। একই বৈঠকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আলজেরিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। ওষুধ, কৃষি, জাহাজ নির্মাণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও সহযোগিতা সমপ্রসারণের বিষয় আলোচনায় আসে।
গত ১১ই অক্টোবর আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি থেকে জানা যায়, বৈঠকে এলএনজি ও এলপিজি আমদানি নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন আলজেরিয়া সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।
এর আগে গত ১০ই সেপ্টেম্বরে জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আলজেরিয়ার হাইড্রোকার্বনবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আরকাবের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের উপায় ও প্রক্রিয়া নিয়ে তারা আলোচনা করেন। একই সঙ্গে হাইড্রোকার্বন খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
আজারবাইজানে আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্মেলন: সফরের প্রথম পর্বে বাকুতে সিআইসিএ’র সপ্তম শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন হুমায়ুন কবির। সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫ই অক্টোবরের এ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্র, পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র এবং সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এশিয়ায় সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা, শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেয়া সম্মেলনটির অন্যতম লক্ষ্য।
বাগদাদে ওআইসি’র অধিবেশন: সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য ইরাক। দেশটির রাজধানী বাগদাদে ১৭ ও ১৮ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে ওআইসি’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৫২তম অধিবেশন। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, মানবিক সংকট এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম ওআইসি। রোহিঙ্গা সংকটেও সংস্থাটির সদস্যদেশগুলোর সমর্থন বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
