লোভাছড়ায় দুই মাসে ছয় কোটি টাকার পাথর লুট

লোভাছড়ায় দুই মাসে ছয় কোটি টাকার পাথর লুট

ফন্ট সাইজ:

পাথর লুটের মহোৎসব চলছে সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাটের লোভাছড়া কোয়ারিতে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার পাথর লুটে নিচ্ছে স্থানীয় সিন্ডিকেট। গত দুই মাস ধরে প্রতিদিনই চলছে এ লুট। স্থানীয়দের হিসাব বলছে; গত দুই মাসে পাথর লুটেরারা এই কোয়ারি থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকার পাথর লুটে নিয়েছে। খনিজ ভরপুর এ কোয়ারির পাথর লুটের ঘটনা পুলিশের অজানা নয়। বরং গোপন সমঝোতায় এ পাথর লুটের ঘটনা ঘটছে। শ্রমিকদের দাবি; মুখ খুললেই মারধর, হুমকি দেয়া হয়। এমনকি চোরাচালান মামলার আসামি করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারির এক সময়ের নিয়ন্ত্রক ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও কানাইঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ পলাশ। আওয়ামী লীগের শাসনের সময় পলাশ অন্য আরেক জনের নামে লিজ নিয়ে লোভাছড়া কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন করেন।

লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখায় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ২০১৯ সালের শেষ দিকে অভিযান চালিয়ে কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেন। একই সঙ্গে প্রায় এক কোটি ঘনফুট পাথর জব্দ করে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে ওই কোয়ারিতে পলাশের আধিপত্য কমে যায়। তবে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক তমিজ উদ্দিন আহমদের নিয়ন্ত্রণ কোয়ারি থেকে কমেনি। এরই মধ্যে খনিজ ব্যুরোর পক্ষ থেকে জব্দ হওয়া পাথরের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ ঘনফুট পাথর পিয়াস এন্টারপ্রাইজকে ইজারা দেন। ইজারায় শরিক ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান। তবে পানি কম থাকায় পিয়াস এন্টারপ্রাইজ পরিবহন করতে না পারায় তারা পাথর সরাতে পারেনি। এ নিয়ে এখনো আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এর বাইরে মালিকানা নিয়ে আরও চারটি রিট উচ্চ আদালতে রয়েছে। এই অবস্থায় গত কয়েক মাস ধরে অবাধে লোভাছড়ায় পাথর লুটের মহোৎসব চলছে। সরজমিন দেখা গেছে; প্রতিদিন সকাল থেকে শত শত নৌকা নিয়ে শ্রমিকরা কোয়ারিতে প্রবেশ করে। এরপর তারা পূর্বের ফেলে রাখা পাথর নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে উত্তোলন করে নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছে। হিসাব দিয়ে শ্রমিকরা জানায়, ছোটো নৌকায় করে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার পাথর পরিবহন করা সম্ভব। এসব পাথর তারা কয়েক কিলোমিটার দূরবর্তী এলাকায় স্টোন ক্রাশার মিলে বিক্রি করে।

কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই পাথর কোয়ারি প্রশ্নের জবাবে কয়েকজন শ্রমিক জানান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তজিম উদ্দিন, ময়নুল মেম্বার, ইসলাম উদ্দিন, ইফজাল আহমদ, শিব্বির আহমদ, খালিক আহমদ, বাবুল মিয়া, উস্তার মেম্বার, হারিছ আলী, জীবন আহমদ, আলাউদ্দিন, আব্দুস সাত্তার, হাসন আহমদ, সয়ফুল আলম ও শহীদ রানা সহ কয়েকজন সিন্ডিকেট করে ওই পাথর লুটপাট চালাচ্ছে। লোভাছড়া থেকে কয়েক মাইল দূরের এলাকা আটগ্রামের ৯টি, আন্দরমুখের দু’টি, দলই মাটি চাউনি থেকে সড়কের বাজার পর্যন্ত ১০টি, সতীপুর স্কুলের পাশে ৩টি, বাগান বাজার থেকে মুলাগুল মধ্যখানে ৫টি, মুলাগুল থেকে বড়গ্রামের মধ্যখানে ৬টি স্টোন ক্রাশার মিলে বিক্রি করা হয়। শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- কম করে হলেও গত দুই মাসে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার পাথর লুট করা হয়েছে। হিসাবে দেখা গেছে, লুট করা পাথরের মূল্য হবে প্রায় ৬ কোটি টাকা। এসব পাথরের বেশির ভাগই যায় ময়নুল মেম্বারের স্টোন ক্রাশারের। রাতে চলে স্টোন ক্রাশার। দিনে বিক্রি করে দেয়া হয়।

কানাইঘাটে কোনো বৈধ স্টোন ক্রাশার নেই। পাথরখেকোরা আড়ালে রেখে রাতের বেলা এসব স্টোন ক্রাশার পরিচালনা করে। দুর্গম এলাকায় স্টোন ক্রাশার হওয়ার কারণে অনেক সময় অভিযানও পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। শ্রমিকরা জানায়, গত ৮ থেকে ১০ মাস ধরে লোভাছড়ায় পাথর লুট হচ্ছে। গত দুই মাসে লুটের পরিমাণ বেশি। এর কারণও রয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে পাথরখেকোরা লোভাছড়া কোয়ারির জিরো পয়েন্ট এলাকায় পাথর লুট চালিয়েছিল। ওই সময় বিজিবি বাধা প্রদান করলে পাথরখেকো লুটকারী সদস্যরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিজিবি’র ওপর হামলা করে। এ সময় বিজিবি সদস্যদের আগ্নেয়াস্ত্র লুট করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। পরে সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এ ঘটনায় পাথরখেকো ইসলাম উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে বিজিবি’র পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। পুলিশ এখন লুট বাহিনীর কথায় চলে। শ্রমিকরা জানিয়েছে- প্রতি বারকি নৌকা থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা নেয়া হয়। প্রতিদিনই লাইনম্যান এই টাকা উত্তোলন করে। ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পুলিশের নামে তোলা হয় বলে জানান তারা। এ ব্যাপারে কানাইঘাট থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন- পুলিশ কখনো টাকা নেয় না।

তবে লোভাছড়ায় পুলিশ রয়েছে। টহলরত অবস্থায় কেউ পাথর লুট করতে পারে না। মাঝে মধ্যে ডিউটি বদলের সময় পাথর নেয়া হতে পারে। তিনি বলেন- পাথর লুটের সঙ্গে পুলিশের কারও সম্পৃক্ততা পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কানাইঘাটের ইউএনও সুমাইয়া ফেরদৌস জানিয়েছেন- পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। গত সপ্তাহে টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়েছে। লোভাছড়া লোড, আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আক্তার হোসেন জানিয়েছেন- এখন যে পাথর লুট হচ্ছে সেখান থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। যদি চলতি মৌসুমে কোয়ারি লিজে যায় তাহলে সরকার এবার কোয়ারির ন্যায্যমূল্য পাবে না। কেউ তো আর শূন্য কোয়ারি ইজারা নেবে না।