প্রবাসীর চোখে জল, পাশে থাকুক বাংলাদেশ!

প্রসঙ্গ মধ্যপ্রাচ্য

প্রবাসীর চোখে জল, পাশে থাকুক বাংলাদেশ!

ফন্ট সাইজ:

একটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। থেমে গেছে শুধু একটি উড়োজাহাজের যাত্রা নয়, কোনো পরিবারের স্বস্তি, কোনো শ্রমজীবী মানুষের কর্মস্থলে ফেরার স্বপ্ন, কোনো মায়ের নিশ্চিন্ত অপেক্ষা। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে ফিরে যাওয়া যাত্রীদের উদ্বেগ তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবিকা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং অনিশ্চিত সময়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা যখন সৌদি আরবের বিমান চলাচলে প্রভাব ফেলছে, তখন এই মানুষগুলোর উৎকণ্ঠা আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ নন; তাঁরা আমাদের পরিবারের সদস্য, দেশের অর্থনীতির শক্তি এবং জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই শুধু আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদে বাংলাদেশ মিশন। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ছবি, ভিডিও কিংবা তথ্য ধারণ, আদান-প্রদান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে সৌদি আইনের বিধিনিষেধ মেনে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ সংকটের সময় একটি গুজব, যাচাই না করা ভিডিও কিংবা অসতর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। যে দেশে বসবাস করছি, সে দেশের আইন ও নিরাপত্তাবিষয়ক নির্দেশনা মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।

তবে সতর্কবার্তার পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া, জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে তা জানানো এবং বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। দূতাবাসের নির্দেশনা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন একজন সাধারণ শ্রমিকও বুঝতে পারবেন—কী করবেন, কোথায় যোগাযোগ করবেন এবং জরুরি প্রয়োজনে কীভাবে সহায়তা পাবেন। সংকটের সময় মানুষ শুধু নির্দেশনা চান না; তাঁরা ভরসাও চান।

৫ হাজার ৪১৮ যাত্রীর পেছনে কত গল্প! বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত হওয়ার প্রভাবে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ৫১টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৪১৮ যাত্রী। এর মধ্যে ১২টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে। সংখ্যাটি বড়। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যে আলাদা জীবন, আলাদা গল্প, আলাদা স্বপ্ন রয়েছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরছিলেন। কেউ ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে চেয়েছিলেন। কেউ নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কারও হয়তো চিকিৎসা কিংবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে যাত্রা করা দরকার ছিল।

বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়া একজন যাত্রীর কাছে বিষয়টি শুধু টিকিটের সময়সূচি বদলে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অতিরিক্ত খরচ, কর্মস্থলে অনুপস্থিতির জটিলতা, নিয়োগকর্তার অসন্তোষ কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কা।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যান্য বিমান সংস্থার ফ্লাইটের অবস্থাও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি।

নিরাপত্তার স্বার্থে ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত অনেক সময় অনিবার্য। বিমান সংস্থাগুলোর প্রথম দায়িত্ব যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু একই সঙ্গে যাত্রীদের প্রতি তাদের মানবিক দায়িত্বও রয়েছে।

শুধু ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা নয়, টিকিট পরিবর্তন, অর্থ ফেরত, বিকল্প যাত্রাপথ এবং নতুন সময়সূচি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা বিদেশে কর্মস্থলে ফেরার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যাত্রা করতে চান, তাঁদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চাকরি হারানোর ভয় যেন আরেক সংকট না হয়। প্রবাসী কর্মীদের অনেকেই সীমিত আয়ের মানুষ। বিদেশে যাওয়ার জন্য কেউ ঋণ করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, কেউ পরিবারের সঞ্চয় ব্যয় করেছেন। মাস শেষে তাঁদের পাঠানো অর্থে চলে দেশের অসংখ্য পরিবারের সংসার, সন্তানের পড়াশোনা এবং মা-বাবার চিকিৎসা।

এই মানুষগুলো যখন অনিবার্য কারণে কর্মস্থলে ফিরতে পারেন না, তখন তাঁদের উদ্বেগ শুধু নিজের চাকরি নিয়ে থাকে না; পরিবারের ভবিষ্যৎও সেই উদ্বেগের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ফ্লাইট বাতিলের কারণে কোনো কর্মী যদি নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারেন, তাহলে তাঁর অনুপস্থিতিকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে? নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁকে কে সহায়তা করবেন? চাকরিতে যোগদানের সময় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কীভাবে সংগ্রহ করবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কিন্তু উত্তর খোঁজার পথে তাঁদের একা ফেলে রাখা উচিত নয়।

বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। কর্মীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি অভিযোগ গ্রহণের জন্য কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এমন উদ্যোগ হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু একজন বিপদগ্রস্ত কর্মীকে এটুকু আশ্বাস দিতে পারবে, দেশ তাঁর সমস্যার কথা শুনছে। রাষ্ট্রের মানবিক উপস্থিতি কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের এই দুই পবিত্র নগরীর ওপর কোনো হুমকি এলে বাংলাদেশ বসে থাকবে না; সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।

বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে মক্কা ও মদিনা গভীর ধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্র। বাংলাদেশের মানুষের কাছেও এই দুই নগরীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ বিষয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক। তবে আবেগকে দায়িত্বশীল কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করাই রাষ্ট্রের প্রজ্ঞার পরিচয়। আন্তর্জাতিক আইন, শান্তিপূর্ণ সমাধান, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সবকিছুকে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে তার অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। কোনো সংকটে বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকা হতে পারে শান্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং মানবিক সহায়তার পথ খোলা রাখা। পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেখানে বসবাসরত ও কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাও। ধর্মীয় অনুভূতি এবং নাগরিকের জীবন-জীবিকা দুটিই রাষ্ট্রের বিবেচনায় সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

প্রবাসীর পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়: এই সংকট আমাদের সামনে একটি সুযোগও তৈরি করেছে, প্রবাসীদের সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ।

প্রথমত, সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য নিয়মিত ও হালনাগাদ নিরাপত্তা নির্দেশনা প্রকাশ করতে হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে কমিউনিটি সংগঠন, শ্রমিকদের আবাসস্থল ও নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমেও তথ্য পৌঁছে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ফ্লাইট বাতিলের তথ্য দ্রুত যাত্রীদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যাত্রীরা যেন বিমানবন্দরে গিয়ে প্রথমবার জানতে না পারেন যে তাঁদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এ জন্য এসএমএস, ফোনকল ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার জরুরি।

তৃতীয়ত, দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা ভাষাগত সমস্যা, আর্থিক সংকট কিংবা নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের জটিলতায় পড়েছেন, তাঁদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।

চতুর্থত, প্রবাসীদের পরিবারকেও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া উচিত। বিদেশে থাকা স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ না হলে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিয়মিত তথ্যপ্রবাহ তাঁদের উদ্বেগ কিছুটা হলেও কমাতে পারে।

পঞ্চমত, সংকট-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি থাকা দরকার। ফ্লাইট কখন স্বাভাবিক হবে, কতজন কর্মী ফিরতে পারবেন না এবং তাঁদের কী ধরনের সহায়তা লাগতে পারে, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় ও সমন্বয় প্রয়োজন। তবে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সহজ হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্তও অনেক সময় অনিবার্য। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সংকটের মধ্যেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে। বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একজন শ্রমিক যদি জানতে পারেন তাঁর টিকিটের কী হবে, কর্মস্থলে যোগাযোগ করবেন কীভাবে এবং প্রয়োজনে কোথায় সহায়তা পাবেন, তাহলে তাঁর অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও কমবে। সৌদি আরবে অবস্থানরত একজন বাংলাদেশি যদি বিপদের সময় দূতাবাসের সহায়তা পান, তাহলে তিনি অনুভব করবেন, হাজার মাইল দূরেও তাঁর দেশ তাঁর পাশে আছে। আমরা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাব রাখি। তাঁদের অবদানের কথা বলি। দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের ভূমিকার প্রশংসা করি। এখন সময় এসেছে তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নেও একই গুরুত্ব দেখানোর। কারণ প্রবাসী বাংলাদেশি কেবল অর্থনীতির একটি সংখ্যা নন। তিনি কারও বাবা, কারও মা, কারও ভাই, কারও বোন। তাঁর অপেক্ষায় দেশে একটি পরিবার বেঁচে থাকে, তাঁর পাঠানো অর্থে একটি সংসার চলে, তাঁর নিরাপদে ফেরার আশায় একটি বাড়িতে আলো জ্বলে। সংকটের সময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার শক্তি নয়, তার মানবিকতা। সৌদি আরবে অস্থিরতার এই সময়ে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা একটাই প্রবাসীরা যেন নিরাপদ থাকেন, তাঁদের জীবিকা যেন অকারণে বিপন্ন না হয় এবং বিপদের মুহূর্তে তাঁরা যেন কখনো নিজেদের একা মনে না করেন।

প্রবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, পরিবারের উদ্বেগ কমুক, আর রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হোক। কারণ প্রবাসীরা শুধু দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেন না, তাঁরা সমৃদ্ধ করেন দেশের প্রতিটি পরিবারের স্বপ্ন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো তাই কেবল দায়িত্ব নয়, আমাদের মানবিক অঙ্গীকার।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]