হুতিরা কতটা শক্তিশালী, তারা আসলে কী চায়?

হুতিরা কতটা শক্তিশালী, তারা আসলে কী চায়?

ফন্ট সাইজ:

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত শনিবারের হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এরপর রোববার বিমানবন্দরটিতে আরেক হামলায় আরও একজন নিহত হয়েছেন। এসব হামলার জন্য ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের দায়ী করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিও এসব হামলার দায় স্বীকার করে আরও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর ছাড়া সৌদি আরবের অন্য বিমানবন্দরগুলো যেকোনো সময় হামলা হতে পারে।

হুতিরা কারা?
হুতিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ, যার অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ধর্মীয় নেতা হুসেইন আল-হুতির নেতৃত্বে এই আন্দোলনের উত্থান ঘটে।
গোষ্ঠীটি শিয়া ইসলামের একটি শাখা জায়েদি মতবাদের অনুসারী। ইয়েমেনে জায়েদিরা সংখ্যালঘু হলেও দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের বিরুদ্ধে ছয় দফা যুদ্ধে অংশ নেয় হুতিরা। প্রথম দফার যুদ্ধেই হুসেইন আল-হুতি নিহত হন। এরপর আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুতি। এখনও তিনিই গোষ্ঠীটির প্রধান।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের মার্চে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দিতে সামরিক জোট গঠন করে সৌদি আরব। ওই সরকার মূলত সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় ইয়েমেনের প্রায় ৩০ শতাংশ ভূখণ্ড হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ বসবাস করত তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায়।

কী চায় হুতিরা?
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তরাঞ্চলের জন্য অধিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল হুতিদের অন্যতম লক্ষ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দাবি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন তারা ইয়েমেনের শাসনক্ষমতার কর্তৃত্ব হিসেবেও স্বীকৃতি পেতে চায়।
ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের স্থল, আকাশ ও নৌ অবরোধের অবসান দাবি করে আসছে গোষ্ঠীটি। তবে সৌদি আরব এই অবরোধের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করে।
গত রোববারের বিবৃতিতে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসন’ বন্ধ এবং অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবের গভীরে হামলা আরও বাড়ানো হবে। এ কৌশলকে তিনি ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ, উত্তেজনার জবাবে উত্তেজনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে হুতিদের লক্ষ্য কেবল ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রভাবের বিরোধিতা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে ১০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি।
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি তাদের। ২০২৫ সালের মে মাসে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সাময়িকভাবে এসব হামলা বন্ধ হয়।
এ বছরের মার্চে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে হুতিরা।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?
ইরান আনসার আল্লাহকে হিজবুল্লাহ ও হামাসের পাশাপাশি নিজেদের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ২০০০-এর দশকের শেষ দিক থেকেই তেহরান গোষ্ঠীটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা চালিয়েছে। হুতিদের অস্ত্রভাণ্ডারের একটি বড় অংশ ইরানে নকশা করা অথবা দেশটি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হুতিরা নিজেদের ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো প্রক্সি বা প্রতিনিধিত্বকারী বাহিনী হিসেবে স্বীকার করে না।

সামরিক শক্তি কতটা?
গত এক দশকে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে তাদের যোদ্ধার সংখ্যা আনুমানিক ৩০ হাজার ছিল। ২০২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়। তবে তাদের প্রকৃত সদস্যসংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
প্রচলিত অর্থে শক্তিশালী নৌবাহিনী কিংবা উল্লেখযোগ্য বিমানশক্তি নেই হুতিদের। কিন্তু ড্রোন, বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন নৌযান এবং মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে তাদের হাতে।
এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ফলে ইয়েমেনের বাইরে, এমনকি ইসরাইল পর্যন্ত হামলা চালানোর সামর্থ্য দেখিয়েছে গোষ্ঠীটি।