মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের তুলে ধরেছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে শহরটির পরিচিতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের প্রাণঘাতী হামলায় সেই নিরাপত্তার ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রিয়াদে বসবাসরত বিদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে থেকে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা কতটা নিরাপদ।
গত শনিবার সৌদি আরবের প্রধান বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে সৌদির পূর্বাঞ্চলে তেল স্থাপনা ও দাম্মাম বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে গোষ্ঠীটি।
হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেয়া এবং চলতি বছরের শুরুতে সানার বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাব হিসেবেই তারা এসব আক্রমণ চালিয়েছে।
সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল ইখবারিয়ায় প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সাদা পোশাক পরা ওমরাহযাত্রীরা মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বিমানবন্দরের একটি লাউঞ্জ। ছাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে মেঝেতে পড়তে থাকলে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন যাত্রীরা।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের একজন ধর্মীয় নেতা, সিরিয়ার চার সন্তানের এক মা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক। পরদিন দ্বিতীয় দফার হামলায় আরও একজন নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে ৩৯ বছর বয়সী বৃটিশ নাগরিক বিলাল বলেন, ‘ধর্মীয় সফরে যাওয়ার পথে তীর্থযাত্রীদের কখনোই প্রাণহানির আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করতে হওয়া উচিত নয়।’
গত অন্তত সাত বছর ধরে রিয়াদে বসবাস করছেন বিলাল। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর হামলার পক্ষে কোনো যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব নয়। বহু বছর আগে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যা-ই করে থাকুক না কেন, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার কোনো ন্যায্যতা নেই।
নিরাপদ নগরীর ভাবমূর্তিতে আঘাত
রিয়াদে অতর্কিত হামলায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা তাৎক্ষণিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। তবে এর প্রভাব শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরব যে ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে, হুতিদের হামলা তাতে বড় আঘাত হেনেছে।
গত রোববার সৌদিতে একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনে প্রত্যাশার তুলনায় খুব কম প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’। সাম্প্রতিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে সৌদি আরব কতটা স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ তুলে ধরতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিলাল জানান, সৌদি আরবে তার ভালো বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন রয়েছে। সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়া তার জন্য কঠিন। তবে হামলার মাত্রা ও ঘনঘন আক্রমণের ঘটনায় প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে বেসামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রিয়াদে গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে বসবাস করেছেন আরেক বৃটিশ নাগরিক মোহাম্মদ। তিনিও সৌদি আরবকে পরিবার নিয়ে বসবাসের নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্র বিমানবন্দরকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করতে না পারায় তিনি উদ্বিগ্ন।
মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানরাও চলমান ঘটনায় বেশ ভয় পেয়েছে।’
সন্তানদের নিরাপদ থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। কিন্তু স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানানোয় পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মোহাম্মদের ভাষায়, ‘রিয়াদ আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।’
সৌদির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নতুন ঝুঁকি
হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতকে বিপজ্জনক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত অনেকটা অচলাবস্থায় ছিল। তবে জুলাইয়ে সানার বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ইরান থেকে হুতি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমান বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত রাজধানীতে অবতরণ ঠেকাতে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।
এর জবাবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পাল্টা অবরোধ আরোপের হুমকি দেয় হুতিরা। লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে গোষ্ঠীটি।
বর্তমান উত্তেজনার শিকড় ২০১৪ সালে। সে সময় জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত এবং ইয়েমেনের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন নিরসনে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত জাতীয় সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে শক্তি বাড়ায় হুতিরা।
নতুন ফেডারেল কাঠামোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি। একপর্যায়ে রাজধানী সানা দখল করে তারা। পিছু হটতে বাধ্য হয় প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ২০১৫ সালের মার্চে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় সামরিক অভিযান।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা ও বৃটেনের তৈরি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। এ যুদ্ধে ক্ষুধা, রোগব্যাধি এবং মৌলিক সেবাব্যবস্থার পতনসহ নানা কারণে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযান পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। পরে তিনি দেশটিকে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিনোদন ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু হুতিদের হামলা এবং ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ সৌদির সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
