চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এতে চলতি মৌসুমের চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, জমিতে সার প্রয়োগের প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষককে সার সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে কৃষিকাজের খরচ ও ভোগান্তি। আসন্ন রবি শস্য চাষে সার নিয়ে হাজার হাজার কৃষকের হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিএপি সার নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত কৃষক সমাজ। কারণ ডিএপি সার বীজ বপনের পৃর্বে জমির নিচে দিতে হয়। কৃষকদের দাবি- সার নিয়ে ডিলারদের যোগসাজশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করা হচ্ছে এবং বাইরে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। ফসলের সঠিক বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করা জরুরি। কিন্তু সময়মতো সার না পাওয়ায় তারা সমস্যায় পড়ছেন। দ্রুত সার সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরজমিন শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সার নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। মনাকষা বাজারে সার ডিলার আকবর আলীর নামে তার ভাই নজরুল ইসলামের সারের গোডাউনের সামনে সহস্রাধিক কৃষক সারের জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষায় থাকা তারাপুর থেকে আসা শামীম জানান, আমি গত শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে এ পর্যন্ত সার পাইনি। তিনি আরও জানান, এ মৌসুমে আমি ২০ বিঘা জমি চাষ করছি। তাতে ডিএপি সার লাগবে কমপক্ষে চার বস্তা। এখন পর্যন্ত এক বস্তাও পাইনি। পারচৌকার তাহসান (৭০) বলেন, আমি অসুস্থ মানুষ হয়েও গতরাত ২টা থেকে অপেক্ষা করছি। ভিড়ে আমার আইডি কার্ডটিও জমা দিতে পারিনি। চার বিঘা সরিষা ও দুই বিঘা ভুট্টা চাষ করছি। ডিএপি সার লাগবে কমপক্ষে দুই বস্তা। সাহাপাড়ার আব্দুস সালাম জানান, তিন ভাগের একভাগ ডিএপি সার গোপনে বেশি দামে ডিলার ও কৃষি অফিসাররা যোগসাজশ করে বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছে। আর আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি। আমি অনেক চেষ্টা করেও সরকারি গোডাউন থেকে সার না পেয়ে বাইরের দোকান থেকে ১৮০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা ডিএপি সারের বস্তা কিনেছি। কয়েকটি গোপন সূত্রে জানা গেছে, ডিএপি সারের সরকারি রেট হলো ১০৫০ টাকা। কিন্তু গোডাউনের ম্যানেজার ও ডিলাররা গোপনে ১২০০ বস্তা দরে বিক্রি করে দিচ্ছে। বাইরের দোকানদাররা ডিএপি সার বস্তাপ্রতি ১৭০০-১৮০০ টাকা করে বিক্রি করছে। সরজমিন উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে ও দেখে একই চিত্র পাওয়া গেছে। তবে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নয়ন মিয়া জানান, কোনো সার সংকট নেই। কোনো সিন্ডিকেট নেই। সার নিয়ে কোনো দুর্নীতিও হচ্ছে না। সার সংকটের গুজবের কারণে কৃষকরা অগ্রিম সার মজুত রাখতে বিশৃঙ্খলা ঘটাচ্ছে। আমরা বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করেছি। শিবগঞ্জে ২৩ জন ডিলার রয়েছে। তাদের ম্যানেজারের মাধ্যমে সঠিকভাবে সার বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, রবি শস্য মৌসুমে ডিএপি ৭৬০ টন, এমওপি ৩০০ টন, টিএসপি ২২৫ টন ইউরিয়া, ৫০০ টন বরাদ্দ দেয়া হযেছে। যা চাহিদা মোতাবেক দেয়া হয়েছে। কোনো সার সংকট হবে না। তিনি আরও জানান, ম্যানেজার বা অন্য কেউ কোনো ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করতে পারবে না। কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সার সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ন্যায্যমূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট থাকলে তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। কৃষকদের দাবি, দ্রুত পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে চলতি মৌসুমে চাষাবাদ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমবে। আমরা গোডাউন থেকে সারের বস্তা দেয়ার সময় গণনা করে দিই এবং ডিলারদের গোডাউনে পৌঁছানোর পর আবারো বস্তা গণনা করা হয় এবং বিতরণের সময় প্রতিটি গোডাউনে এক বা দুইজন করে উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের উপস্থিতিতে আবারো গণনা করে বিতরণ শুরু করা হয়।
শিবগঞ্জে সার সংকট বিপাকে কৃষক
মো. ইমরান আলী, শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) থেকে
১২ অক্টোবর (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
