শুক্রবার আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে সামনে এলো এক তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্য। অসলো থেকে শান্তিতে নোবেল জয়ী ঘোষিত হন ৮৫ বছর বয়সী বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ঠিক তার পরেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি)’র ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ট্রাম্প প্রশাসন। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের পক্ষে পিল্লাইয়ের স্বীকৃতির দিনেই আদালতটির উপর এই পদক্ষেপ বিশ্ব জুড়ে আইনের শাসন এবং শক্তিধর রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
নাভি পিল্লাইয়ের পুরো জীবনটাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস। ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের এক দরিদ্র গ্রামে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে তার জন্ম। বাবা ছিলেন বাসচালক। স্থানীয় ভারতীয় সম্প্রদায়ের সাহায্যে তিনি নাতাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বর্ণবাদী শাসনের বৈষম্য ও অত্যাচার দেখে তিনি বড় হন। সব বাধা পেরিয়ে ১৯৬৭ সালে তিনি নাতাল প্রদেশে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান খোলেন। সেখানে তিনিই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী, যিনি এ কাজ করেন। কারণ কোনো শ্বেতাঙ্গ প্রতিষ্ঠানই তাকে চাকরি দিতে রাজি হয়নি।
১৯৭৩ সালে তিনি রবেন দ্বীপের কারাগার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করে জেতেন। এই কারাগারেই বন্দি ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। ওই আইনি লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজবন্দিদের পক্ষে লড়তে গিয়ে এবং বর্ণবাদী পুলিশের নির্যাতন উন্মোচন করতে গিয়ে তিনি বারবার ঝুঁকিতে পড়েছেন। ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদের অবসান ঘটে। ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরের বছর, ১৯৯৫ সালে, পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। এই লড়াই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে অনমনীয় এক সাহসের প্রতীক বানিয়ে তোলে।
১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক নির্বাচিত করে। ১৯৯৮ সালের ২রা সেপ্টেম্বর জ্যাঁ-পল আকায়েসুর মামলায় তিন বিচারকের বেঞ্চের একজন হিসেবে তিনি অংশ নেন এক ঐতিহাসিক রায়ে। প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেয়, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা গণহত্যার অপরাধের অংশ হতে পারে। এই রায় আন্তর্জাতিক আইনে যৌন সহিংসতার বিচারকে নতুন ভিত্তি দেয়।
২০০৩ সালে নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রথম ১৮ বিচারকের একজন নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নিযুক্ত হয়ে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ব জুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান।
পিল্লাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ভূমিকা ছিল ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডসংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে। তার নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান এবং ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আচরণ বিশ্লেষণ করে। ২০২৫ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে কমিশন সিদ্ধান্ত দেয়, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হারজগ, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্ট গণহত্যায় উস্কানি দিয়েছেন বলেও কমিশন মত দেয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সমালোচনা ও সমর্থন দু’টোই এসেছে। ইসরাইল একে ‘বিকৃত ও মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। দাবি জানায় কমিশন বিলুপ্তির। ইসরাইলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে কমিশনের সদস্যরা হামাসের দোসর। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আগেও কমিশনকে একপেশে বলে সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে কমিশনের কাজের জন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশংসাও ছিল। পিল্লাই পক্ষপাত ও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ইসরাইলের সহযোগিতা না পেলেও কমিশন নিজে তদন্ত ও যাচাই করেছে এবং সাক্ষীদের বক্তব্য শুনেছে।
সমালোচকদের প্রতি তার চ্যালেঞ্জ: কোন তথ্য ভুল, তা দেখিয়ে দিন।
?বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার বিচারেও বিচারক হিসেবে কাজ করছেন। গাজা, রোহিঙ্গা ও সুদানের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, জবাবদিহি এবং রায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হলো-আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নিজস্ব পুলিশ বাহিনী নেই। আইসিজের রায় কার্যকর করা এবং আইসিসি’র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন অনেকাংশে রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। আইসিজের রায় না মানার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকলেও, সেখানে রাজনৈতিক সমীকরণ ও স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা কার্যকর পদক্ষেপের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে আইসিসি’র ক্ষেত্রে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার ও আদালতে হাজির করার জন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা অপরিহার্য। ফলে রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রভাবশালী রাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং সহযোগিতার অভাবে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইসিসি’র বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংঘাতকে সামনে আনে। আদালত যখন তাদের বা তাদের মিত্রদের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন আদালতকেই ‘অবৈধ’ বলা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ করে যে, পরাশক্তিগুলোর কাছে আন্তর্জাতিক আইন অনেক সময় দুর্বল দেশগুলোকে দাবিয়ে রাখার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
?নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াতনে ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা প্রবল চাপের মুখে, আক্রান্ত হচ্ছে এর প্রতিষ্ঠানগুলোও। তার মতে, আইনের বদলে শক্তির প্রাধান্য বিশ্বে স্থিতিশীলতা, আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে দুর্বল করে। এই প্রেক্ষাপটে নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে।
পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থানের কথা বলে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পদক্ষেপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থান সেই অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল স্বীকৃতি তাই আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশ্ব কি শক্তির প্রাধান্য মেনে নেবে, নাকি সবল ও দুর্বল-সবার জন্য সমানভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগোবে?
