আবারো প্রশ্ন ফাঁস তীব্র ক্ষোভ সড়ক অবরোধ

পরীক্ষা বাতিল, তদন্ত কমিটি গঠন

আবারো প্রশ্ন ফাঁস তীব্র ক্ষোভ সড়ক অবরোধ

ফন্ট সাইজ:

সকাল ১১টায় পরীক্ষা। প্রায় সাড়ে তিন লাখ চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার হলে পরীক্ষার শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কোথাও কোথাও প্রশ্নপত্রও বিলি করা হয়। এমন অবস্থায় খবর আসে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য আসায় থেমে যায় পরীক্ষা গ্রহণের সব প্রক্রিয়া। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পরীক্ষার্থীদের মাঝে। তারা কোথাও কোথায় সড়কে নেমে বিক্ষোভ-অবরোধ করেন। পরীক্ষা শুরুর আগ মুহূর্তে এভাবে পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনা নিকট অতীতে হওয়ার কোনো নজির নেই। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি পদে নিয়োগের জন্য এই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। রাজধানীর ১০০টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর আসন বণ্টন করা হয়েছিল। সারা দেশ থেকে পরীক্ষার্থী রাজধানীতে এসেছিলেন পরীক্ষায় অংশ নিতে।

ওদিকে, ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। স্থগিত পরীক্ষাটি আগামী ১৬ই অক্টোবর শুক্রবার বিকাল ৩টায় আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। নেটিজেনদের অনেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং চাকরিপ্রত্যাশীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

আরও পড়ুন:
থমথমে দিল্লি

পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণায় অধিদপ্তরের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরীক্ষা আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর আগে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এ কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

পরীক্ষা স্থগিতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে নামেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। শাহবাগ, নীলক্ষেত মোড়, মানিক মিয়া এভিনিউ, শাপলা চত্বর, মতিঝিলের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশ এবং বাঙলা কলেজের সামনে বিক্ষোভ ও অবরোধের খবর পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও পরীক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচলে বাধা দেন। কেউ কেউ প্রবেশপত্র পুড়িয়েও প্রতিবাদ জানান।
রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ’র আড়ং সিগন্যাল এলাকায় আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। এ ছাড়া বাঙলা কলেজের সামনের সড়ক ও সাতমসজিদ সড়ক এলাকাতেও পরীক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। বিক্ষোভকারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন। একইসঙ্গে এ ঘটনার দায় নিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদত্যাগও দাবি করেন কেউ কেউ।
পরীক্ষা দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে এসেছিলেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নেয়ার পর পরীক্ষা দিতে এসে শেষ মুহূর্তে স্থগিতের সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে হয়েছে। এতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ বাড়তি অর্থব্যয়ের পাশাপাশি মানসিক চাপেও পড়েছেন তারা।

ঢাকা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা এক চাকরিপ্রত্যাশী জানান, তারা রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। পরীক্ষা দিতে তাদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা যাত্রা করতে হয়েছে। কেন্দ্রে পৌঁছে অনিবার্য কারণে পরীক্ষা স্থগিতের খবর পান তারা। কর্তৃপক্ষ চাইলে আগেই পরীক্ষার্থীদের জানাতে পারতো। কিন্তু সকালে কেন্দ্রে আসার পর তাদের পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানানো হয়। যাতায়াত ও অন্যান্য খাতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যয় করে ঢাকায় এসে এ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। কেন শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত করা হলো, তার জবাব চান তিনি।

রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা আরেক চাকরিপ্রত্যাশী জানান, পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরীক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে সকাল ১১টার দিকে পরীক্ষা না হওয়ার কথা তাদের জানানো হয়। আরেক পরীক্ষার্থী দাবি করেন, পরীক্ষার আগেই ফেসবুকে সম্ভাব্য প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে থাকা প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের মিল ছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, অনেক পরীক্ষার্থী ঢাকার বাইরে থেকে এসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা আন্দোলনে নেমেছেন।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এর আগে, পরীক্ষার আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ট্যাটাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে অধিদপ্তরের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, তার এক আত্মীয়সহ একটি চক্র জড়িত বলে দাবি করা হয়। ওই স্ট্যাটাসে প্রার্থীপ্রতি গড়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকায় চুক্তির অভিযোগও তোলা হয়। এই পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রশ্নও যোগ করা হয়। সরকারি চাকরির প্রস্তুতির বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে অনেকেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষায় আসা প্রশ্ন একই বলে দাবি করেন। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নেবে বলে জানায়। এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি গত ১৭ই মে প্রকাশিত হয়।

এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন প্রশ্নপত্রে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে তারা। শনিবার ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। অতীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার বিপরীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া গেলে পরীক্ষা স্থগিত করা শ্রেয়তর পদক্ষেপ।

তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধের দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংগঠনটি। বিবৃতিতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, পরীক্ষার জন্য ঢাকায় এসে শেষ মুহূর্তে স্থগিতের সিদ্ধান্তের মুখে পড়া চাকরিপ্রত্যাশীদের মানসিক, আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। তারা এ ঘটনার নিন্দা জানান এবং দ্রুত নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবি করেন।
এদিকে স্থগিত হওয়া সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষাটি আগামী ১৬ই অক্টোবর শুক্রবার বিকাল ৩টায় আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শনিবার অধিদপ্তরের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। পরীক্ষার্থীদের মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে নতুন তারিখ ও সময় জানানো হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে এখন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।