আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে পুরনো ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে সরকার এখন ৩ বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের (৪.৫ বিলিয়ন) একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের
ডিসেম্বর নাগাদ এই ঋণচুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় ৭ দিনব্যাপী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় যোগ দেবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরবর্তী ঋণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আগামী নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে বলে জানা গেছে। ওই সফরেই ঋণের সংস্কার ও শর্ত চূড়ান্ত হবে। তবে শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। শর্তের মধ্যে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব শর্ত পুরনো ঋণ কর্মসূচিতেই ছিল। কিন্তু সেই শর্ত পূরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। ওই সময়সীমায় এসব সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। নতুন ঋণের ক্ষেত্রে এসব সংস্কার করতে বাড়তি সময় পাওয়া যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি এবারের বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে ভালো অগ্রগতি হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি অনুমোদন করে আইএমএফ। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ঋণসহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেই ঋণের ৭ কিস্তির মধ্যে ৫ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ঋণ কর্মসূচির আকার ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।
কিন্তু পরিবর্তিত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় তা জানিয়ে দেয় সরকার। গত ৩রা জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য চিঠি দেয় সরকার। তখন আইএমএফের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছিল।
নতুন ঋণ কর্মসূচির বেশকিছু শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত মে মাসে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কখনো সশরীরে বৈঠক হয়, কখনো ভার্চ্যুয়াল উপায়ে বৈঠক করে উভয়পক্ষ। শর্তগুলোর মধ্যে সংস্কারই প্রাধান্য পেয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারব্যবস্থার উপর ছেড়ে দেয়া; রাজস্বনীতি ও আদায় আলাদা করা; করছাড় যৌক্তিক করা; দেউলিয়া আইন করা; সরকারের ভর্তুকি কমানো।
গত মে মাসে যখন নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার, তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পুরনো কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত দেশি প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, ভর্তুকি কমানোসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি এগোয়নি। এসব সংস্কার জাতীয় স্বার্থেই করতে হবে। এসব সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা করা সময়ের অপচয়।
