ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন দেশটির সাবেক ১২৪ জন আমলা ও কূটনীতিক। এক খোলা চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলতে হলে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে। প্রমাণহীন অভিযোগ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।
ভারতের নাগরিকদের উদ্দেশে লেখা এই চিঠি এমন সময়ে এলো, যখন ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে বিরোধীরা। শনিবার দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ বিরোধী দলের একাধিক নেতা।
সাবেক এই কর্মকর্তারা বলেছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে। ভোটার তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংরক্ষণÑসব ক্ষেত্রেই তাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই। প্রমাণ ছাড়াই এখন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এ ধরনের প্রতিটি অভিযোগ সবার গণতান্ত্রিক আস্থায় আঘাত হানে।’
অতীতের নির্বাচনী সহিংসতা ও কারচুপির চিত্র তুলে ধরে তাঁরা বলেন, একসময় ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রের ভয় দেখানো, প্রভাবশালীদের লোকজনের দাপট, ব্যালট বাক্স ছিনতাই কিংবা ভুয়া ভোট দেয়া এবং ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়ার ঘটনা ছিল সাধারণ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ১৯৮৯ সালে ভোটকেন্দ্র দখলকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে ভারতের সংসদ।
চিঠিতে বলা হয়, ‘আমরা জানি, কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে কেমন। যখন সহিংসতা কথা বলে, তখন গণতন্ত্র নীরব হয়ে যায়।’
বিহারের নির্বাচনকে উদাহরণ
নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নতির উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনের কথা তুলে ধরেছেন সাবেক আমলা-কূটনীতিকরা। তাঁদের দাবি, বিহারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ওই নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রে পুনর্র্নিবাচন হয়নি। ১৯৫১ সালের পর সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতিও রেকর্ড করা হয়েছে। নারীদের ভোটদানের হার ছিল রেকর্ডসংখ্যক।
তাঁদের ভাষ্য, কর্মকর্তারা হঠাৎ সাধু হয়ে যাওয়ায় এমনটা ঘটেনি; বরং নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রার্থীর এজেন্ট ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভোট গণনার স্বাক্ষরিত হিসাব পান। ইভিএম এজেন্টদের স্বাক্ষরসহ সিলগালা করে নিরাপদ কক্ষে রাখা হয়, যেখানে প্রার্থীদের প্রতিনিধিরা নজরদারি করতে পারেন। পাশাপাশি মেশিনে গণনা করা ভোটের সঙ্গে কাগজের স্লিপ মিলিয়ে দেখা হয়।
২০২৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও এই ব্যবস্থার পক্ষে রায় দিয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি, নির্বাচনে বড় ধরনের কারচুপি করতে হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকারের অধীনে কর্মরত হাজার হাজার কর্মকর্তা এবং পরাজিত প্রার্থীদের এজেন্টদেরও নীরব থাকতে হবে। এমন কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলেও তাঁরা দাবি করেন।
‘সন্দেহ ব্যবস্থায়, নাকি ফলাফলে?’
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যেই চিঠিটি প্রকাশ করা হলো। শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে আটক হন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার।
বিরোধীদের উদ্দেশে চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যে নির্বাচনী ব্যবস্থা তাঁদের অতীতে জয় এনে দিয়েছে, এখন সেই ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েই তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন কেন।
চিঠিতে বলা হয়, ‘যে ব্যবস্থাকে আপনারা কারচুপিপূর্ণ বলছেন, সেই ব্যবস্থাই যদি আপনাদের বিজয় এনে দিয়ে থাকে, তাহলে নিজেদের প্রশ্ন করুনÑআপনারা কি ব্যবস্থাটিকে সন্দেহ করছেন, নাকি শুধু ফলাফলকে?’
সাবেক আমলা-কূটনীতিকদের মতে, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। ভোট গণনা হয়নি বা ভোটের কোনো মূল্য নেই-এমন অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকলে তা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনে জনগণের সমর্থন হারানোর পর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতেই কেউ কেউ এ ধরনের বয়ান তৈরি করছেন।
